যশোরে খামারে মাছ মরার নেপথ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নয়, ব্যবস্থাপনার ঘাটতি : তদন্ত প্রতিবেদন
যশোরের শার্শা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের সোনামুখী বিলসংলগ্ন এএফ মৎস্য খামারে মাছ মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট নয়, বরং খামারের সার্বিক ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি।
সম্প্রতি ওই খামারে ব্যাপক হারে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত তদন্ত কমিটি গতকাল মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ, বিদ্যুৎ সরবরাহের রেকর্ড যাচাই এবং মৎস্য বিভাগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়ের পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করা হয়।
তদন্তে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ২২ আগস্ট রাত ১টা ৪২ মিনিট থেকে রাত ২টা ২৬ মিনিট পর্যন্ত মোট প্রায় ৪৪ মিনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এর আগে ও পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট ফিডারে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। তবে খামারে লোডশেডিংয়ের পূর্ব থেকেই মাছ মারা যেতে থাকে বলে তদন্তে উঠে আসে। ফলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে মাছের মৃত্যু হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্যের কোনো তথ্যগত সমর্থন মেলেনি।
তদন্ত কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত জলাশয়ের পরিস্থিতি ও পানির গুণাগুণ পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, খামারে অতিরিক্ত ঘন মাছের মজুদ, উচ্চ আমিষসমৃদ্ধ খাদ্য প্রয়োগ, জৈব ও নাইট্রোজেনজাত বর্জ্যের চাপ, ফাইটোপ্ল্যাংকটনের অস্বাভাবিক আধিক্য, পানির পিএইচ ও অ্যামোনিয়ার অসামঞ্জস্য এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা গেছে। পাশাপাশি প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত এয়ারেশন ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অনুপস্থিতিও পরিলক্ষিত হয়েছে। এসব কারণের সম্মিলিত প্রভাবই মাছের মৃত্যুর মূল কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মাণ হয়েছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।
খামার মালিকপক্ষ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিপুল মাছ, বৃহৎ বিনিয়োগ ও ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজনীয় জেনারেটর স্থাপন সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে। তদন্ত কমিটি বলছে, খামারপক্ষের দাবি করা বিনিয়োগ ও সম্পদের পরিমাণের তুলনায় জরুরি পরিস্থিতিতে এয়ারেশন ব্যবস্থা সচল রাখার উপযোগী বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে সামান্য ছিল। এ ছাড়া ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে খামার মালিকপক্ষের বক্তব্য বিদ্যুৎ বিভাগের সরবরাহ রেকর্ড ও তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে জানিয়েছে কমিটি।
সার্বিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, মাছের মৃত্যুর প্রধান কারণ বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি বা ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট নয়; বরং অতিরিক্ত মাছের মজুত ঘনত্বের বিপরীতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা, পর্যাপ্ত এয়ারেশন, বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করাসহ খামারের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাই এ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার আশীষ কুমার দাস স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জনস্বার্থে সঠিক তথ্য উপস্থাপনের লক্ষ্যে যথাযথ ফ্যাক্ট-চেকিং ও তথ্য যাচাই ব্যতীত কোনো বিভ্রান্তিকর, অতিরঞ্জিত বা যাচাইবিহীন তথ্য প্রচার না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সাইফুল ইসলাম সজল, যশোর