বিয়ের কথা বলে ডেকে হত্যার পর পোড়ানো হয় মরদেহ, গ্রেপ্তার ২
কথা ছিল ১৬ আগস্ট বিয়ে করবেন। বিয়ের কথা শুনে নতুন জুতা, জামাকাপড় ও প্রসাধনী সামগ্রী কিনেছিলেন মেরিনা বেগম। সঙ্গে নিয়েছিলেন জাতীয় পরিচয়পত্রও। কিন্তু এই বিয়েই যে তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা জানতেন না তিনি। নওগাঁর ধামইরহাটে এক গৃহবধূকে হত্যার পর তার মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সামগ্রীও উদ্ধার করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুরে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। গ্রেপ্তাররা হলেন- ধামইরহাট এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল হোসেন (৪৯) ও একই এলাকার বাসিন্দা তারেক রহমান (২১)।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, গত ১৮ আগস্ট সন্ধ্যায় গোয়েন্দা শাখার (ডিএসবি) মাধ্যমে খবর পাওয়া যায়, ধামইরহাট উপজেলার একটি আমবাগানের মধ্যে পোড়া মরদেহ পড়ে আছে। খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল সেখানে গিয়ে মধ্যবয়সী এক নারীর আগুনে পোড়া মরদেহ দেখতে পায়। মরদেহের পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল প্রসাধনী সামগ্রী ও জাতীয় পরিচয়পত্র।
পুলিশ সুপার বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি সিআইডি ও পিবিআইকে জানানো হয় এবং গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করা হয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় তদন্ত ও ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকায় আনা হয়। এরপর মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অপর আসামি তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, নিহত মেরিনা বেগমের ছেলে কাউসার আলী ও তার স্বামী হাসেন আলী জীবিকা নির্বাহের জন্য কুমিল্লায় থাকেন। তারা বাড়ির বাইরে থাকার সুযোগে দুধ কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে মেরিনা বেগমের সঙ্গে সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল হোসেনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের সম্পর্ক গভীর হলে মেরিনা বেগম বাবুল হোসেনকে বিয়ের জন্য চাপ দেন। তখন বাবুল তাকে আগামী ১৬ আগস্ট বিয়ে করার কথা বলেন।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, বিয়ের কথা বিশ্বাস করে মেরিনা বেগম প্রসাধনী সামগ্রী, চিরুনি ও জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে ১৬ আগস্ট দুপুরে বাড়ি থেকে বের হন। এদিকে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল হোসেনসহ চারজন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট দুপুরে মেরিনা বেগম বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাকে নিয়ে আসতে বাবুল হোসেন, তারেক রহমানসহ অন্য দুজনকে শাহাপুর ইউনিয়নে পাঠানো হয়। শাহাপুর থেকে মেরিনা বেগমকে রাত ১০টার দিকে অগ্রাদিগুণ বাজারে নিয়ে আসা হয়। পরে অগ্রাদিগুণ বাজার থেকে তারা একত্র হয়ে মনিহারি-তালপুকুরগামী পাকা সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় যায়। সেখানে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা রেখে সড়ক থেকে প্রায় ৩০০ ফুট দক্ষিণে ভলকাডাঙ্গা নামের একটি বড় আমবাগানের ভেতরে মেরিনা বেগমকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে বাবুল হোসেনের নির্দেশে তারেক রহমান ও আরও একজন বেল্ট দিয়ে মেরিনা বেগমের গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। পরে আশপাশ থেকে খড়কুটো সংগ্রহ করে তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে গ্যাসলাইট দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আসামিরা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।
পুলিশ সুপার বলেন, গ্রেপ্তার দুজনসহ মোট চারজন মিলে মেরিনা বেগমকে হত্যা করেন। মরদেহ যাতে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য পরে পেট্রোল ঢেলে তার মুখমণ্ডলসহ শরীরের ঊর্ধ্বাংশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে নওগাঁর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) জয়ব্রত পাল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জিন্নাহ আল মামুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পত্নীতলা সার্কেল) শরিফুল ইসলামসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ