নওগাঁয় কেজিতে ৯০ টাকা বেড়েছে সুগন্ধি আতপ চালের দাম
ধান চাল উৎপাদনে বরাবরই শীর্ষে উত্তরের জেলা নওগাঁ। এখানকার উৎপাদিত সুগন্ধি চালের বিশেষ কদর রয়েছে সারা দেশের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে। গেলো এক সপ্তাহ ধরে চালের বাজারে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। সুগন্ধি চালের দাম কেজিতে এবার ২-৪ টাকা নয় বেড়েছে ৯০ টাকা। নওগাঁর বাজারে এক কেজি আতপ চালে ৯০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে এখন ২১০ টাকায়। শুধু তাই নয়, সুগন্ধীর পাশাপাশি বেড়েছে কাটারিসহ সব ধরনের সরু চালের দামও।
দেশের বৃহত্তর চালের মোকাম নওগাঁয় ঠিক এমনই টালমাটাল চালের বাজার। ক্রেতা এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বড় কিছু মিল আর করপোরেট কোম্পানিগুলোর মজুত সিন্ডিকেটের কারণেই বাড়ছে চালের দাম। তবে মিল মালিক আর ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, সরকারিভাবে বিদেশে আতপ চাল রপ্তানি আর হাটে ধানের বাড়তি দামের কারণেই ঊর্ধ্বমুখী চালের বাজার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ের কথা বললেও বাস্তবে দেখা মিলেনি কারোই।
নওগাঁ শহরের সবচেয়ে বড় খুচরা চাল বাজার ঘুরে দেখা যায়, গেলো ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে সকল প্রকার সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত। বাজারে মোট বিক্রির ৮০ শতাংশই হয় কাটারি চাল। শর্টার ও নন শর্টারসহ সব ধরনের কাটারিরর দাম কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা। ৭৬ টাকা কেজির চাল ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়। স্বর্ণা-৫ জাতের চাল ২ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫১ টাকায়। বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি। কয়েকদিন আগেও যার দাম ছিল ৫৮ টাকা। তবে স্মরণ কালের সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে সুগন্ধি (আতপ) চাল। দুই সপ্তাহ আগেও এই চাল বাজারে বিক্রি হচ্ছিল ১২০ টাকা কেজিতে। কিন্তু প্রতিদিনই বৃদ্ধি পেতে পেতে এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতেই বেড়েছে ৯০ টাকা। চালের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে সাধারণ ভোক্তাদের মাঝে। বাজারে চাল কিনতে এসে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
নওগাঁ সদর উপজেলার ডাক্তারের মোড় এলাকা থেকে পৌর চাল বাজারে আতপ চাল কিনতে এসেছিলেন মোসলেম উদ্দিন। তিনি বলেন, গ্রামের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য ১৫ কেজি আতপ চাল কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু বাজারে এসে শুনি সেই চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৯০ টাকা। এভাবে হঠাৎ করেই দাম বেড়ে যাওয়াই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
উপজেলার বালুভরা গ্রামের কৃষক আল ফারুকের সঙ্গে কথা হয় নওগাঁর খুচরা বাজারে। ৫ কেজি ভাতের চাল কিনতে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎই দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, এভাবে দাম বাড়লে যারা দিন এনে দিন খান তাদের জন্য চাল কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
নওগাঁ পৌর ক্ষুদ্র চাল বাজারের ব্যবসায়ী রহমত আলী বলেন, ৪০ বছর ধরে চালের ব্যবসা করে আসছি। আমার ব্যবসার জীবনে এতটা দাম বৃদ্ধি কখনও দেখিনি। বিশেষ করে আতপ চালের দাম এতটা বৃদ্ধির পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ আছে বলে মনে হয়না। প্রতিদিনই ক্রেতাদের কাছ থেকে বাঁকা কথা শুনতে হচ্ছে আমাদের।
আরেক ব্যবসায়ী আনোয়ার অভিযোগ করে বলেন, কিছু বড় মিলার ও করপোরেট ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতেই চাল কিনে মজুত করেছেন। তারাই মূলত এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।
তবে অবৈধ মজুদের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন নওগাঁর মিল মালিক ও ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের দাবি–যাদের কাছে মজুত আছে তারা সরকারের মজুত নীতি মেনেই মজুত করেছে।
মফিজ উদ্দিন অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক তৌফিকুল ইসলাম বাবু জানান, সরকার কয়েক মাস ধরেই আতপ চাল রপ্তানির অনুমতি দিয়ে রেখেছে। দেশ থেকে এবার বড় পরিসরে আতপ চাল বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। যার কারণেই আতপের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। আর আতপের যোগান কমে যাওয়ায় চাপ বেড়েছে অন্যান্য সরু চালে। মানুষ আতপের চাহিদার অনেকটাই কাটারিসহ অন্যান্য সরু চাল দিয়ে মিটাচ্ছেন। যার কারণেই সরু ও আতপের দাম কিছুটা বেশি। তিনি বলেন, নওগাঁতে দু-এক জায়গায় স্বল্প পরিসরে সুগন্ধি আতপ চালের উৎপাদন হলেও দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুগন্ধী আতপ চাল উৎপাদন হয় দিনাজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।
নওগাঁ চাউলকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, কোনো মিলারই অবৈধ মজুত কারণে না। বহু বছর লোকসানের পর এবারই কিছুটা লাভের মুখ দেখছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি চালের দাম বাড়ায় কৃষকরা ধানের দাম বেশি পাচ্ছেন। ধান বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বর্তমানে হাটগুলোতে প্রতি মণ কাটারি ১ হাজার ৮০০ আর আতপ কিনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৭০০ টাকায়।
নওগাঁ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ফরহাদ খন্দকার বলেন, মূলত সুগন্ধি আতপ চাল বিদেশে রপ্তানির কারণেই দাম বেড়েছে কিছুটা। তিনি বলেন, আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৬১ হাজার মেট্রিক টন সুগন্ধি আতপ চাল সর্বনিম্ন ১ দশমিক ৬ ডলার রেটে (এক কেজি) বিদেশে রপ্তানি করার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় অনুমতি দিয়েছেন। ৩১ ডিসেম্বরের পরে এ বিষয়ে পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে।
নওগাঁয় অটোমেটিক ও হাসকিং মিলিয়ে ৪৫০ মিল রয়েছে। খাদ্য বিভাগ প্রতিনিয়তই মিলগুলোতে নজর রাখছে। অবৈধ মজুত অনুসন্ধানে মাঠে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ