জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম-খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন সাক্ষী সাজ্জাদুল
গুম ও হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাক্ষ্য দিয়েছেন মেজর (অব.) খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম। সাক্ষীর জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, র্যাবে যোগদানের প্রথম রাতেই দেখি জিয়াউল আহসান চোখ বাঁধা এক বন্দির মাথার পেছনে গুলি করে সেতুর নিচে ফেলে দেন। ১০ মিনিট পর আরও একজনকে হত্যার জন্য আমাকে নির্দেশ দিলে অস্বীকৃতি জানালে আমাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে পরদিন র্যাব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ওই রাতে তিনটি স্পটে তিনজনকে হত্যা করেছিল জিয়াউল আহসান।
আজ রোববার (২৬ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মূর্তজার নেতৃত্বে বেঞ্চে এ সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।
জবানবন্দিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, আমি ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ২৬তম বিএমএ লং কোর্সে কমিশন লাভ করি এবং ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে মেজর পদে থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করি।
জিয়াউল আহসানের গুম-খুনের বর্ননা দিয়ে সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০১১ সালে সরকারি আদেশে আমাকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র্যাবে) বদলি করা হয়। ২০১১ সালের ৫ জুলাই আমি র্যাব সদর দপ্তরে যোগদান করি। তখন আমার পদবি ছিল মেজর। ২০১১ সালের ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই ছয় দিনে র্যাব সদরদপ্তরে ডকুমেন্টেশন, পোশাক প্রস্তুতি এবং সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়।
সাক্ষীর জবানবন্দিতে সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, ওই সময় র্যাব সদর দপ্তরে লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স (গোয়েন্দা শাখার পরিচালক) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার সঙ্গেও আমার দেখা হয়। পরদিন ২০২১১ সালের ১১ জুলাই আমাকে র্যাব সদর দপ্তর হতে র্যাব-৩ এ বদলি করে পাঠানো হয়। ঐ দিন দুপুর ১২টায় আমি র্যাব-৩ এ যোগদান করি।
জবানবন্দিতে সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, র্যাব-৩ এ তখন কমান্ডিং অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম। আমি র্যাব-৩ এ যোগদানের পর কমান্ডিং অফিসারের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমার কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেন এবং কথাবার্তার এক পর্যায়ে তিনি আমাকে বলেন যে, আজ রাতে একটা অপারেশন হবে এবং সেখানে আমাকে যেতে হবে। এটি লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের নির্দেশ।
সাজ্জাদুল ইসলাম আরও বলেন, কমান্ডিং অফিসারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর নির্দেশ মোতাবেক আমি আমার ক্যান্টনমেন্টের বাসায় ফিরে আসি। এরপর ওইদিন রাতেই, অর্থ্যাৎ ২০২১১ সালের ১১ জুলাই রাত আনুমানিক ১১টায় লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম, মেজর তরিকুল এবং আরও একজন অফিসারসহ সাদা পোশাকে র্যাব সদর দপ্তরের গেটে গিয়ে পৌঁছাই। আমাদের গাড়িটি পৌঁছানোর পর র্যাব সদর দপ্তরের ভিতর থেকে আরও তিনটি গাড়ি এসে যোগ দেয়। এরপর গাড়ি চারটি র্যাব সদর দপ্তর থেকে রওনা শুরু করে। টংগীর আহসানুল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার পার হয়ে ডানে গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে ভিতরের দিকে একটা রাস্তা দিয়ে গাড়িগুলো চলতে থাকে। প্রায় ৪০-৪৫ মিনিট চলার পর গাড়িগুলো একটি ব্রিজের উপর গিয়ে দাঁড়ায়।
সাক্ষী সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, ঐ রাস্তা দিয়ে এর পূর্বে আমি কখনো যাতায়াত করিনি। গাড়িগুলো ব্রিজের উপর দাঁড়ানোর পর সবাই নামেন। একজন চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা বন্দিকে গাড়ি থেকে নামানো হলে লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান সেই বন্দিকে ধরে নিয়ে ব্রিজের রেলিংয়ের সঙ্গে ঠেকিয়ে তার মাথার পেছন দিক থেকে গুলি করে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। আমি মাত্র কয়েক ঘণ্টা পূর্বে র্যাবে যোগদান করেছি, এই ঘটনাটি দেখে আমি হতবিহ্বল হয়ে পড়ি। এরপর সবাই ওঠার পর গাড়িগুলো আবার চলতে শুরু করল। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়িগুলো আবার একটি ব্রিজের উপর গিয়ে দাঁড়াল। আবার সবাই গাড়ি থেকে নামল। একটু সামনে এগোতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন জিয়াউল আহসান। তিনি আমাকে ইঙ্গিত করে বললেন, এখানে একটি সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে এবং তুমি সেটা করবে।
মেজর (অব.) সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, আমি স্যারকে (জিয়াউল আহসান) জিজ্ঞেস করলাম, স্যার সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন কী? কারা সন্ত্রাসী? শোনার পর তিনি অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। তিনি চিৎকার করে আমাকে বললেন, ইউ ব্লাডি কাওয়ার্ড অফিসার, স্টুপিড। আমি স্যারকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম—স্যার কী কাজ করতে হবে এবং কাজটি যদি সঠিক না হয়, তাহলে আমি কোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারব না। স্যার আমার ওপর আরও রেগে বললেন, ইউ ব্লাডি গো অ্যান্ড সিট ইনসাইড ভেহিকল, আই উইল ডিল ইউর কেস সেপারেটলি।
জবানবন্দিতে সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, স্যারের (জিয়াউল আহসান) এই কথা শুনে, আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গাড়ির ভেতর গিয়ে বসলাম। আমার সারা গায়ে ঘাম বের হচ্ছে, আমি ভয়ে দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করলাম এবং মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে শুরু করলাম। ঐ সময়ে লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানের মুখের ওপর কথা বলা মানে নিজের জীবনের ঝুঁকি, চাকরি এবং নিজেকে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কিছু ছিল না। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভাবছি, আমাকে হয়তো অ্যানকাউন্টার অপারেশন দেখিয়ে মেরে ফেলবে অথবা আগামীকালই আমার চাকরি চলে যাবে অথবা দুর্গম কোনো জায়গায় আমাকে বদলি করে দেবে।
সাজ্জাদুল ইসলাম আরও বলেন, আমি ভয়ে কাঁপছি এর মাঝেই আমার কানে বাইরে থেকে একটি অস্পষ্ট আওয়াজ ভেসে আসে। সেটি গুলির শব্দ বলেই মনে হলো। প্রায় ৮-১০ মিনিট পর বাকিরা সবাই গাড়িতে ফিরে এলো এবং গাড়িগুলো আবার চলতে শুরু করল। আমি কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না। এ অবস্থায় কিছুদূর যাবার পরেই আবার গাড়িগুলো থামল। যতটুকু মনে আছে, গাড়ি থেকে যা দেখেছি জায়গাটি বাঁশ ঝাড়ের পাশে। আমি বাদে সবাই গাড়ি থেকে নেমে যায়। কিছুক্ষণ পরে আমি দেখতে পেলাম, চোখ বাঁধা একজন লোককে ২-৩ জন টানাটানি করে রাস্তার বাম পাশ থেকে ডান পাশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর আনুমানিক ৮-১০ মিনিট বাকি সবাই আবার গাড়িতে ফিরে এলো। সবাই যখন যার যার গাড়িতে উঠছিল আমি গাড়িতে বসে যতদূর চোখ গেছে, ঐ চোখ বাঁধা লোকটিকে আর ফিরে আসতে দেখিনি। তখনও আমার ভয় কাটেনি এবং কী ঘটে যাচ্ছে দেখে আমি অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়ি। এরপর গাড়িগুলো ঐ জায়গা থেকে আবার চলতে শুরু করল। আবার কিছুদূর গিয়ে ২-৩ বার গাড়িগুলো থেমেছে। তবে এবার আর আমাদের কেউ গাড়ি থেকে নামেনি।
সাক্ষী সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এরপর একই রাস্তা ধরে আমাদের গাড়িটি ক্যান্টনমেন্টের স্টাফ রোডে এমপি চেকপোস্টে পৌঁছানোর পর আমাকে নামিয়ে দেওয়া হয় এবং স্টাফ রোডেই আমার বাসা ছিল। আমি হেঁটে আমার বাসায় চলে যাই। ভয়ে আমার পা যেন চলছিল না। পরদিন, অর্থ্যাৎ ২০১১ সালের ১২ জুলাই সকাল ১০টার দিকে আমি আমার ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে র্যাব-৩ এর দিকে রওনা দিই। পথিমধ্যে আমি জানতে পারি, আমাকে র্যাব থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বদলি করে দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, র্যাব-৩ এ পৌঁছানোর পর আমাকে কিছুক্ষণ পরেই গমনাদেশ দিয়ে দেওয়া হয় এবং আমার বদলিকৃত ইউনিট অর্ডন্যান্স ডেপো কুমিল্লা সেনানিবাসে যোগদানের আদেশ গ্রহণ করি। র্যাব থেকে কোনো অফিসারকে সেনাবাহিনীতে বদলি করলে তখন প্রথমে সেনা সদরে প্রেরণ করা হতো, সেখান থেকে বদলিকৃত ইউনিটে যেতে হতো। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এটি ঘটল না। আমাকে সরাসরি আমার বদলিকৃত ইউনিটে প্রেরণ করা হয়। এরপর ৩-৪ দিনের ভেতর জাতীয় পত্রিকা প্রথম আলোতে গাজীপুর, জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তিনটি লাশ পাওয়া গেছে মর্মে খবর প্রকাশিত হয়।
সাজ্জাদুল ইসলাম আরও বলেন, ২০১১ সালে র্যাবে এই ঘটনার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আমাকে একজন অবিশ্বস্ত ও অবাধ্য অফিসার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ঐ সময় দেখেছি যাদের সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি ছিল তারা সবাই যেন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। একজন সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও ন্যায়পরায়ণ অফিসার হওয়া সত্যেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আমার আর পদোন্নতি হলো না। আমি ২০১৩ সালে অবসরের মেয়াদকাল ১২ বছর বাকি থাকতেই স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করে নতুন কর্মজীবন শুরু করি।

নিজস্ব প্রতিবেদক