‘লাশটিতে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল, পেট কাটা ছিল’
সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ রোববার (২৩ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিজাম উদ্দিন হাওলাদার। জবানবন্দিতে তিনি জানান, বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরের চাল রায়েন্দা এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ করা হয় ২০১০ সালের ১৭ মে। লাশটির শরীরে জমাটবদ্ধ সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল। লাশটি অর্ধগলিত ছিল। লাশের পেট কাটা ছিল। এসব কথা তাকে থানার চৌকিদার ফোনের মাধ্যমে জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আজ ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৩১ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে ৯ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন নিজাম উদ্দিন হাওলাদার। তিনি ২০১০ সালে বাগেরহাটের শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছিলেন।
সাক্ষীর জবানবন্দিতে মো. নিজাম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, আমি বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত অভিরিক্ত পুলিশ সুপার। ২০১০ সালের ১৭ মে ওসি হিসেবে বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানায় কর্মরত ছিলাম। ঐ তারিখে আমি সরকারি বিশেষ কাজে পুলিশ সুপারের কার্যালয় বাগেরহাটে যাই। আনুমানিক বেলা ৩টার কিছু পর শরণখোলা থানার একজন চৌকিদার আমাকে ফোন দিয়ে জানায়, বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ পড়ে আছে। এলাকাটির নাম চাল রায়েন্দা। লাশটির শরীরে জমাটবদ্ধ সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল। লাশটি অর্ধগলিত ছিল। লাশের পেট কাটা ছিল। মাথাটি কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। লাশের হাত পা বাঁধা ছিল। এসব কথা উক্ত চৌকিদার ফোনের মাধ্যমে আমাকে জানায়।
নিজাম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, আমি বিষয়টি থানার দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) ইকবালকে জানাই। তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলি। এসআই ইকবাল জিডি মূলে ঘটনাস্থলে গমন করেন। লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি বাগেরহাট সদর হাসপাতাল পাঠানোর চেষ্টা করেন। তবে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় লাশটি থানায় নিয়ে আসা হয়। ঐ দিন লাশটি আর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়নি।
ট্রাইব্যুনালে নিজাম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, চৌকিদার বাদী হয়ে একটি এজাহার দায়ের করলে এসআই ইকবাল একটি নিয়মিত হত্যা মামলা রুজু করেন এবং নিজেই তদন্তভার গ্রহণ করেন। আমি রাতে থানায় ফিরে লাশটি দেখি। লাশটিতে পচন ধরায় আমি শুধু লাশের বাহ্যিক অবস্থা দেখি। পরের দিন সকালে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্তের পর লাশটি অজ্ঞাত বিধায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়। আনুমানিক দুদিন পর এক ব্যক্তি আমাকে ফোন দেয়। ঐ ব্যক্তি দাবি করেন, প্রাপ্ত লাশটি তার ভাইয়ের। তিনি আরও জানান, আনুমানিক দুই-তিন মাস আগে গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া থেকে তার ভাই অপহৃত হন। কোটালীপাড়া থানায় এ সংক্রান্ত একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেছেন তিনি। আমি তাকে থানায় আসতে বলি।
জবানবন্দিতে মো. নিজাম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, চার-পাঁচ দিন পর ঐ মৃত ব্যক্তির দুই ভাই, স্ত্রী ও চাচা থানায় আসেন। থানায় রক্ষিত মৃত ব্যক্তির শার্ট ও প্যান্ট দেখে তাকে শনাক্ত করা হয়। আগত সবাই দাবি করেন, মৃত ব্যক্তি তাদের আত্মীয়। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী দাবি করে, লাশটি তার স্বামীর। তারা লাশের দাফন সম্পর্কে জানতে চান।
মো. নিজাম উদ্দিন হাওলাদার আরও বলেন, আমি তাদেরকে জানাই, অজ্ঞাত হওয়ার কারণে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি বাগেরহাট কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তারা লাশটি নিজেদের এলাকায় নেওয়ার ব্যবস্থা করতে চায়। আমি তাদের বলি, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লাশ নিতে পারবেন। থানায় আগত ব্যক্তিরা বলেন, লাশটি একজন সাবেক বিডিআর সদস্যের। তার নাম নজরুল ইসলাম। পিলখানা ঘটনার পর তিনি পলাতক অবস্থায় গোপালগঞ্জের একটি ক্লিনিকে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সাক্ষী নিজাম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, লাশ প্রাপ্তির চার-পাঁচ দিন পর খুলনা বিডিআর সেক্টর থেকে একজন কর্নেল পত্রিকার মাধ্যমে জেনে ফোন দিয়ে লাশের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চান। তিনি বলেন, একজন বিডিআর সদস্য থানায় আসবে, তাকে যেন আমি কাগজপত্র দিয়ে সহায়তা করি। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে তিনিও ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে চান। থানায় আগত ব্যক্তিরা ডিএনএ টেস্টের জন্য রাজি হন। এ ঘটনার দুই সপ্তাহ পর আমি রামপাল থানায় চলে যাই। শরণখোলা থানায় আমি ১১ মাস চাকরি করেছি। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে আমি আনুমানিক ছয় বছর চাকরি করেছি। সমসাময়িক সময়ে আমি পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি, ঐ সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের লাশ পাওয়া যাচ্ছিল। তদন্তকারী কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এটিই আমার জবানবন্দি।

নিজস্ব প্রতিবেদক