সুনামগঞ্জে বৃষ্টি কমলেও পাহাড়ি ঢলে ফুঁসছে নদ-নদী
সুনামগঞ্জে সাময়িকভাবে স্থানীয় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীসহ জেলার সব নদ-নদী ও হাওরের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে জেলাজুড়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কায় বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে আজ শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত না হলেও দুপুরের পর থেকে জেলাজুড়ে ফের থেমে থেমে বৃষ্টি হয়।
গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও ঢলের কারণে সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের শক্তিয়ারখলা ও দুর্গাপুর এলাকা এখনও পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। এসব প্লাবিত স্থানে যানবাহনগুলো চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করায় টাঙ্গুয়ার হাওরে যাতায়াতকারী পর্যটকদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এদিকে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ভৌগোলিক কারণে সিলেট ও সুনামগঞ্জে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
আজ শুক্রবার বেলা ৩টায় সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলঘর এলাকায় সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৭ দশমিক ৩০ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, যা গত ২৪ ঘণ্টার তুলনায় ১০ সেন্টিমিটার বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরাম এলাকায় রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে সীমান্ত নদীগুলো দিয়ে তীব্র পাহাড়ি ঢল নামছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মৌসিনরামে ১৭৭ মিলিমিটার এবং চেরাপুঞ্জিতে ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা ও পাটলাই, জগন্নাথপুর উপজেলার নলজুর ও কুশিয়ারা, দোয়ারাবাজারের খাসিয়ামারা, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রক্তি এবং সদর উপজেলার চলতি নদে পানি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন হাওলাদার জানান, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় এই অঞ্চলে আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে, ফলে সীমান্ত এলাকায় প্রচুর বৃষ্টিপাত হতে থাকায় সুনামগঞ্জ জেলায় একটি স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
নদ-নদীর পানি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষের মাঝে বন্যা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে আগাম কিছু প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।
সুনামগঞ্জের হাওর নেতা অ্যাডভোকেট এনাম আহমদ বলেন, সুনামগঞ্জের মানুষ বন্যাসহ যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে জানে। যেহেতু পাউবো ও জেলা প্রশাসন বন্যার সতর্কতা জারি করেছে, তাই হাওর ও শহরের মানুষকে এখন থেকেই আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে। পানি বাড়ির আঙিনায় উঠে গেলে দেরি না করে পরিবারসহ নিকটবর্তী আশ্রয়কেন্দ্র বা বহুতল ভবনে আশ্রয় নিতে হবে এবং ঘরের আসবাবপত্র উঁচু মাচা তৈরি করে তার ওপর তুলে রাখতে হবে। একইসঙ্গে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ঘরে প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, বিশুদ্ধ পানি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, অতিরিক্ত মোমবাতি, দিয়াশলাই ও হারিকেন মজুত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সুনামগঞ্জের হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, এই অঞ্চলের মানুষকে প্রায় প্রতি বছরই বন্যার মুখোমুখি হতে হয়। এ সময় মানুষ নিজের পাশাপাশি গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন। তাই বন্যা শুরু হওয়ার আগেই গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে বা আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া উচিত এবং তাদের খাবারের জন্য পর্যাপ্ত খড় ও ধান মজুত রাখা প্রয়োজন, যাতে নিজেরাও বাঁচেন এবং গবাদিপশুগুলোকেও বাঁচাতে পারেন।
এদিকে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করতে জেলা প্রশাসন থেকে ইতিমধ্যে একটি বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান জানান, জেলার ১২টি উপজেলাতেই সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী ও কমিটির সদস্যদের নিয়ে দুর্যোগপূর্ব প্রস্তুতি সভা সম্পন্ন করা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে field পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। বর্তমানে জেলায় মোট ১৩১১টি আশ্রয়কেন্দ্র, ৪৮৪টি সাধারণ নৌকা এবং ৮টি স্পিডবোট সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে কাজ করার জন্য ১২০১ জন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি ইরা, ব্র্যাক ও রেড ক্রিসেন্টের আরও ১২০০ জন কর্মী প্রস্তুত আছেন। চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গঠন করা হয়েছে ১০৫৬টি মেডিকেল টিম। দুর্যোগকালীন সহায়তার জন্য ১২টি উপজেলাতেই জিআর চাল, শুকনো খাবার, ঢেউটিন এবং ২,৯৯,৫০০টি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে অতিরিক্ত সাহায্য এসে পৌঁছেছে এবং সব উপজেলার ইউএনও, পিআইও ও ইউপি চেয়ারম্যানদের সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী, সুনামগঞ্জ