নওগাঁয় সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ মাসে ৩০ প্রাণহানি
ছয় মাসে নওগাঁর সড়কে অন্তত ৩০টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। এই মৃত্যুগুলো শুধু কোনো পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি করে ভেঙে পড়া পরিবার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস। কোথাও একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা, কোথাও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া তরুণ ছেলে, কোথাও শিক্ষক, কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী- এক মুহূর্তের অসতর্কতা বা বেপরোয়া গতিতে থেমে গেছে তাদের জীবন। আর সেই সঙ্গে চিরতরে বদলে গেছে বহু পরিবারের জীবনচিত্র।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নওগাঁ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন কৃষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ পথচারী। স্থানীয়দের তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বেশির ভাগ দুর্ঘটনাই ঘটেছে দ্রুতগতির ট্রাক, ড্রাম ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির যানবাহনের মুখোমুখি বা পেছন থেকে সংঘর্ষে।
বছরের শুরুতেই অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি মহাদেবপুর উপজেলার পাটকাঠি এলাকায় বালুবোঝাই একটি ড্রাম ট্রাক অটো চার্জারভ্যানকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন। এরপর ১১ মার্চ নওগাঁ-সান্তাহার বাইপাস সড়কের খলিশাকুড়ি এলাকায় ট্রাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের ভয়াবহ সংঘর্ষে প্রাণ হারান এক দম্পতি। মে মাসে এসে দুর্ঘটনার ভয়াবহতা যেন আরও বাড়ে। পত্নীতলা, বদলগাছী ও মহাদেবপুর উপজেলায় পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কয়েকজন। এর মধ্যে বদলগাছীতে এক সহকারী শিক্ষিকার মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো এলাকায় গভীর শোকের ছায়া ফেলে।
তবে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে গত ২৫ মে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায়। রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের অধিকাংশই ছিলেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার বাসিন্দা। ঈদকে সামনে রেখে প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। কিন্তু উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নেয় বিষাদে। একসঙ্গে এত মানুষের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর সেই নির্মম দৃশ্য এখনও ভুলতে পারেননি মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের বাসিন্দারা।
সড়ক দুর্ঘটনার এই নির্মম থাবায় নিহতদের অনেকেই ছিলেন তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। কোথাও বাবা হারিয়ে সন্তানদের লেখাপড়া ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, কোথাও একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বৃদ্ধ মা-বাবা সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আবার কোনো কোনো পরিবারে স্বামী হারিয়ে সংসারের সব কঠিন দায়িত্ব এসে পড়েছে স্ত্রীর কাঁধে। স্বজনদের চোখের জল শুকিয়ে গেলেও তাদের জীবনের অনিশ্চয়তা আর অন্ধকার যেন শেষ হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বড় কোনো দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের তৎপরতা কিছুদিন চোখে পড়লেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আবার শিথিল হয়ে যায়। ফলে একই ধরনের ও একই কারণে দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। আর কত প্রাণ ঝরলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে- এমনটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রশ্ন।
সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জেলা পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলছে। বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে চালক, যাত্রী ও পথচারী- সবার সম্মিলিত সচেতনতা ভীষণ প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান বা ‘ব্ল্যাক স্পট’ চিহ্নিতকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নওগাঁর সহকারী পরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন চালক এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিআরটিএর নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের এই ধারা আরও জোরদার করা হবে।
অন্যদিকে, নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জরুরি চিকিৎসার ওপর জোর দিয়ে বলেন, দুর্ঘটনার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধের পাশাপাশি জেলা হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ