কিস্তির টাকা দিতে না পেরে চিরকুট লিখে প্রবাসীর স্ত্রীর আত্মহত্যা
ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়ে কিস্তির চাপ সইতে না পেরে চিরকুট লিখে ওই প্রবাসীর স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আবেগঘন এক চিরকুট লিখে তিনি গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে আজ সোমবার (৮ জুন) কুমারখালী পৌরসভার ঝাউতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আত্মহত্যা করা ওই গৃহবধূর নাম জুলিয়া খাতুন (২৭)। তিনি ওই এলাকার কাতার প্রবাসী শাহেদ ইসলাম জাহিদের স্ত্রী।
আত্মহত্যার আগে জুলিয়া খাতুন এক চিরকুটে লিখেছেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমাকে আপনারা সবাই মাফ করে দিবেন। মা তুমি আমাকে মাফ করে দিও। আমি তোমার ভালো মেয়ে হতে পারিনি। তানহাকে তুমি দেখে রেখ।’
স্বজনদের ভাষ্য, কিস্তির চাপ সইতে না পেরে চিরকুট লিখে গলায় ফাঁস নিয়ে জুলিয়া খাতুন (২৭) আত্মহত্যা করেছেন। আজ সকালে নিজঘর থেকে জুলিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাহিদুল-জুলিয়া দম্পতির তানহা (৭) নামে এক মেয়ে সন্তান রয়েছে।
চিরকুটে জুলিয়া খাতুন আরও লিখেছেন, ‘আর আমার শেষ ইচ্ছে হলো আমাকে যেন কোনো পুরুষ না দেখে, সেইটা তোমরা দেখো। আর আমার লাশটাকে তোমরা কাটাছেড়া কইরো না। এটাই আমার শেষ ইচ্ছে। তোমরা পুলিশের কাছেও যেও না কেউ। ও মা, তুমি ঠিকই বলেছিলে। আল্লাহর কাছে সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায় না। আমাকে মাফ করে দিও।’
পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, প্রায় ১০ বছর আগে পারিবারিকভাবে কুমারখালী পৌরসভার ঝাউতলা এলাকার মৃত জহিরুল ইসলামের মেয়ে জুলিয়ার সঙ্গে একই এলাকার ইদ্রিস আলীর ছেলে জাহিদের বিয়ে হয়। তাদের ঘরে তানহা নামের সাত বছর বয়সি এক মেয়ে সন্তান আছে। প্রায় ছয় মাস আগে এনজিও ও ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কাতারে গেছেন জাহিদ। কিন্তু সেখানে চুক্তি অনুযায়ী তিনি কাজ পাননি। ফলে চাহিদা অনুয়ায়ী সময়মতো বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারেন না তিনি। তার শ্বাশুড়ি, বাবা ও স্বজনরা মিলে কিস্তির টাকা কমবেশি করে পরিশোধ করেছেন। তবুও দুই মাসের কিস্তির টাকা বকেয়া পড়ে গেছে। আজ সোমবার সকালে একটি এনজিওতে কিস্তি বাবদ দুই হাজার টাকা পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু সকাল ৭টার দিকে নিজঘরে তাকে গলায় ফাঁস নিয়ে ঝুলতে দেখে তার মেয়ে তানহা। এরপর স্বজনরা জানালা ভেঙে তাকে নিচে নামিয়ে পানি ঢেলে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, প্রবাসী জাহিদের বাড়িতে উৎসুক জনতার ভিড়। কাজ করছে পুলিশ। আহাজারি করছে স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
নিহত জুলিয়ার চাচা রজব আলীর বলেন, ‘সংসারে কোনো অভাব ছিল না। তবে জামাই অনেক টাকা ঋণ করে বিদেশ গেছেন। কিন্তু কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী কাজ দেয়নি। সেই কিস্তির চাপ সইতে না পেরে চিঠি লিখে আত্মহত্যা করেছে জুলিয়া।’
জুলিয়ার শ্বশুর ইদ্রিস আলী বলেন, ‘সংসারে কোনো ঝামেলা নেই। কারো সঙ্গে ঝগড়াও নেই। তবে একটায় সমস্যা, মেলা টাকা লোন আছে। এই টাকা আস্তে আস্তে দিচ্ছে। কিন্তু এই মাসে টাকা পাঠাতে পারেনি আমার ছেলে। সকালে ঋণের কিস্তি দেওয়ার কথা ছিল। তার আগেই এ ঘটনা ঘটে গেছে।’
কুমারখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অর্থনৈতিক দৈন্যতা থেকে জুলিয়া গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। কারো কোনো অভিযোগ না থাকায় সুরহাল শেষে মরদেহটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

এম আর নয়ন, কুষ্টিয়া (কুমারখালী-খোকসা)