৪২ মণের ‘কালাপাহাড়’ দেখতে ভিড়, বিক্রি নিয়ে চিন্তিত মালিক
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার টুপুরিয়া গ্রামে যেন অন্যরকম এক উৎসবের আমেজ বইছে। আর সেই আমেজের কেন্দ্রজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকৃতির এক রাজকীয় ষাঁড়- ‘কালাপাহাড়’। দূর থেকে দেখলেই মনে হয় যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য! বিশাল দেহ, শান্ত চোখ আর দাপুটে উপস্থিতিতে ইতোমধ্যেই এলাকায় আলোচনার ঝড় তুলেছে এই গরুটি।
খামারি মো. মনিরুজ্জামান মৃধা গত পাঁচ বছর ধরে সন্তানের মতো ভালোবাসা আর যত্নে সম্পূর্ণ দেশীয় ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে লালন-পালন করেছেন কালাপাহাড়কে। খড়, ঘাস, ভুসি আর প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে বড় করা এই হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান জাতের ষাঁড়টির উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি, আর দৈর্ঘ্য ১০ ফুট ৫ ইঞ্চি। প্রায় ৪২ মণ ওজনের এই দানবীয় গরুটিকে দক্ষিণবঙ্গের সবচেয়ে বড় গরু বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা। কেউ কেউ আবার বলছেন, এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ষাঁড়ের মধ্যেও একটি।
নিজের মালিককেও উচ্চতায় ছাড়িয়ে যাওয়া কালাপাহাড়কে এক নজর দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত মানুষ। শিশু থেকে বৃদ্ধ- সব বয়সী মানুষের কৌতূহল যেন থামছেই না। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ বিস্ময়ে শুধু তাকিয়েই থাকছেন এই বিশাল প্রাণীটির দিকে। টুপুরিয়া গ্রামের সরু পথ পেরিয়ে প্রতিদিন মানুষের এই ভিড় যেন জানান দিচ্ছে- এবারের কোরবানির ঈদে ‘কালাপাহাড়’ শুধুই একটি গরুর নাম নয়, এটি এখন এক বিস্ময়ের নাম।
খামারি মনিরুজ্জামান জানান, পাঁচ বছর আগে নড়াইলের পহরডাঙ্গা হাট থেকে মাত্র ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকায় তিনি বাছুরটি কিনে এনেছিলেন। প্রতিদিন সকালে নিজ হাতে কালাপাহাড়কে গোসল করিয়ে তার দিন শুরু হয়। কালাপাহাড়ের দৈনিক খাদ্য তালিকায় গমের ভুসি, খড়, চালের কুঁড়া ও ভুট্টার গুঁড়োর পাশাপাশি আপেল, মাল্টা, আঙুরসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ফলমূল থাকে। প্রতিদিন সে ৪০ কেজিরও বেশি খাবার খায়। মনিরুজ্জামানের দাবি, গত পাঁচ বছর ধরে কালাপাহাড়কে লালন-পালন করতে তার প্রায় ১৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
মনিরুজ্জামান আরও জানান, তবে বিশালাকৃতির এই গরুটি বিক্রি করাই এখন তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর বিক্রির উদ্দেশ্যে গরুটিকে ঢাকায় নেওয়া হলেও আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিক্রি করা যায়নি। কালাপাহাড় আকারে অনেক বড় হওয়ায় এবং এর পেছনেই বিশাল অঙ্কের টাকা ও সময় ব্যয় করতে হওয়ায় তিনি অন্য কোনো গরু লালন-পালন করতে পারছেন না। তার মতে, গরুটির অস্বাভাবিক বড় আকৃতি এবং বাজারের মন্দাভাবই সঠিক দাম না পাওয়ার অন্যতম কারণ। তবে ভালো দাম পেলে এবার কোরবানির হাটেই কালাপাহাড়কে বিক্রি করতে চান এই খামারি।
পাবনা জেলা থেকে গোপালগঞ্জে ধান কাটতে আসা ৬২ বছর বয়সী মো. জব্বার হোসেন বলেন, আমি এই জেলায় কাজ করতে এসে পার্শ্ববর্তী গ্রামে এত বড় গরুর কথা শুনে শখের বশে দেখতে আসলাম। আমার জীবনে আমি এত বড় গরু আর কখনও দেখিনি।
উপজেলার পার্শ্ববর্তী মাঝবাড়ি গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আজগার আলী বলেন, আমার দীর্ঘ বয়সে অনেক বড় বড় গরু দেখেছি, কিন্তু এই কালাপাহাড়ের মতো এত বড় গরু আগে কখনও দেখিনি।
গোপালগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. গোবিন্দ চন্দ্র সরদার বলেন, আমার চাকরি জীবনে বা ব্যক্তিগত বয়সে আমি এখন পর্যন্ত এত বড় গরু দেখিনি। গোপালগঞ্জে এর আগে এত বড় গরু কখনও কোনো হাটে উঠেনি। আশা করছি, এবার এই জেলার কোরবানির হাটে কালাপাহাড়ই হবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
ডা. গোবিন্দ চন্দ্র সরদার আরও বলেন, জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে শুরু থেকেই খামারি মনিরুজ্জামানকে সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাধারণত এত বড় গরু সাধারণ হাটে বিক্রি করা কঠিন। তাই আমাদের প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে আসন্ন কোরবানির ঈদে বড় গরু কিনতে আগ্রহী শৌখিন ও বড় ক্রেতাদের সাথে সরাসরি এই খামারির যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া যায়।

মাসুদ পারভেজ, গোপালগঞ্জ