বাংলাদেশি ৩ যুবককে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রির অভিযোগ পরিবারের
উচ্চ বেতনে ভালো চাকরির প্রলোভনে গোপালগঞ্জের তিন যুবককে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রির অভিযোগ তুলেছে তাদের পরিবার। স্বজনদের অভিযোগ, ঢাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে গত ৭ মে তারা রাশিয়ায় পৌঁছালে টাকার বিনিময়ে তাদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর জন্য জোরপূর্বক তাদের কাছ থেকে চুক্তিতে স্বাক্ষর নিয়ে চলছে সামরিক প্রশিক্ষণ। এমন ঘটনায় প্রিয়জনকে হারানোর শঙ্কায় পরিবারগুলোতে চলছে কান্নার রোল।
তিন যুবক হলেন সদর উপজেলার সিতারকুল গ্রামের রনি ফকির, বলাকইড় গ্রামের কবির মোল্লার ছেলে সৌরভ মোল্লা এবং ঘোষেরচর গ্রামের জামিল শেখের ছেলে পলাশ শেখ।
রনি মোল্লার স্ত্রী তৃষা বেগম জানান, তার স্বামীকে দালাল রেজা ও মিজান নামে দুই ব্যক্তি আট লাখ টাকার বিনিময়ে কনস্ট্রাকশনের কাজের কথা বলে রাশিয়ার ভিসার ব্যবস্থা করে দেন। সেই ভিসার কপিতে কোথাও উল্লেখ নেই যুদ্ধের কথা। গত ৬ মে ঢাকায় গিয়ে ৭ মে বেলা ১১টায় হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে রাশিয়ার উদ্দেশে ফ্লাইটের রওনা হন রনিসহ আরো অনেক যুবক। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রথম দু-একদিন যোগাযোগ থাকলেও হঠাৎ করেই তার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল ১৭ মে রাতে তার স্বামী রনি তাকে ফোন করে জানান বাংলাদেশ থেকে তারা যারা একসঙ্গে গেছেন তাদের সবাইকে দালাল চক্র চড়া মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে। তাদের রুশ সেনাবাহিনীর এপিসিতে গাদাগাদি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইউক্রেন সীমান্তের কাছে জঙ্গলে, সেখানে আটজন করে ভাগ করে এক একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নেওয়া হয় যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য এক বছরের চুক্তি নামায় স্বাক্ষর। এখন তাদের সবার চুল দাড়ি কেটে ইউক্রেনে গিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। এরপর আবারও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পরিবারের সঙ্গে।
ভুক্তভোগী সৌরভ মোল্লার বোন রত্না বেগম বলেন, আমার ভাইকে রাশিয়ায় কনস্ট্রাকশনের কাজে বাংলাদেশি টাকায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে দালাল মিজান ও রেজা আরেক ভিনদেশী জুলিয়া নামের এক নারী ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকার জাবালে নূর এজেন্সি রুশ আর্মির কাছে বিক্রি করে দিয়েছে বলে ফোন করে জানিয়েছে। সেনাবাহিনী ঠিকমতো যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না। তাদেরকে এখন প্রস্তুত করা হচ্ছে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য। এ ঘটনায় জড়িত দালাল, এজেন্সিসহ জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি এবং ভাইকে ফেরত পেতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপের আকুতি রত্না বেগমের।
আরেক ভুক্তভোগী পলাশ শেখের বাবা মো. জামিল শেখ বলেন, আমি জমি বিক্রি করে আট লাখ টাকার বিনিময় উন্নত জীবনের আশায় ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। কিন্তু আমার সেই আশা এখন নিরাশায় পরিণত হয়েছে। আমরা পুরো পরিবার এখন হতাশায় ভুগছি। ছেলেটাকে আর জীবিত ফেরত পাব কি?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৌশিক আহমেদ বলেন, আমরা বিষয়টি আজই জানতে পেরেছি। জেলা প্রশাসন থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তিন যুবককে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া দালাল চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। যাতে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা যায়। তবে দালালদের এমন চমকপ্রদ প্রলোভনে না পড়ে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।
পুলিশ সুপার মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। তবে এ বিষয়ে থানায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয়নি। অভিযোগ পেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করব। মানবপাচারকারী দালাল চক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

মাসুদ পারভেজ, গোপালগঞ্জ