১৬ বছরের অপেক্ষার পর ছেলে সন্তান, কেড়ে নিল হাম
বিয়ের দীর্ঘ ১৬ বছর পর তিন কন্যা সন্তানের পর সংসারে এসেছিল একমাত্র ছেলে সন্তান। ছোট্ট সেই মুখটিকে ঘিরে ছিল বাবা-মায়ের হাজারো স্বপ্ন, ভালোবাসা আর দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। কিন্তু সেই সব স্বপ্ন আর আকুলতা ভেঙে চুরমার করে মাত্র ৭ মাস বয়সেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল ফুটফুটে শিশু সাজিদ আল নাহিয়ান। এক বুক অন্ধকার এনে মহামারি হাম কেড়ে নিল সুমন-সুলতানা দম্পতির কোলের ধনকে।
রোববার (১৭ মে) সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সাজিদ। ঢাকার নামি-দামি হাসপাতালসহ টানা ৭টি হাসপাতাল ঘুরেও শেষ পর্যন্ত নিজের একমাত্র ছেলেকে বাঁচাতে পারলেন না অসহায় বাবা-মা। সাজিদের অকাল বিদায়ে এখন কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মুন্সিরহাটের সিংরাইশ গ্রামের বাতাস।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পারভেজ আহমেদ সুমন ও সুলতানা আক্তার দম্পতির বিয়ের দীর্ঘ ১৬ বছরে একে একে জন্ম নেয় তিন কন্যাসন্তান। অনেক অপেক্ষা আর প্রার্থনার পর মাত্র ৭ মাস আগে তাদের ঘর আলোকিত করে জন্ম নিয়েছিল সাজিদ আল নাহিয়ান। পরিবারের সবার চোখের মণি ছিল সে। তিন বোনও তাদের আদরের ছোট ভাইকে ঘিরে প্রতিদিন নতুন নতুন স্বপ্ন বুনছিল।
পারিবারিক সুখের এই আবহেই হঠাৎ গত ১৪ এপ্রিল জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত হয় সাজিদ। প্রথমে তাকে চৌদ্দগ্রাম বাজারের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে কিছুটা সুস্থ বোধ করলেও গত ১২ মে আবারও মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে শিশুটি। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ভর্তি করা হয় চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
সেখানে অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে প্রথমে ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতাল, পরবর্তীতে ঢাকার শেরেবাংলা নগরের শিশু হাসপাতাল, ন্যাশনাল হেলথ কেয়ার হাসপাতাল এবং সর্বশেষ তেজগাঁওয়ের ইমপালস হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা জানান, শিশু সাজিদ মারাত্মক হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে। একপর্যায়ে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সব আধুনিক চিকিৎসা আর বাবা-মায়ের আকুল প্রার্থনা ব্যর্থ করে দিয়ে রোববার সকালে না ফেরার দেশে পাড়ি জমায় ছোট্ট সাজিদ।
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন পিতা পারভেজ আহমেদ সুমন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ১৬ বছর পর আমার ঘরে ছেলে সন্তান এসেছিল। ওকে ঘিরে কত স্বপ্ন ছিল আমাদের। চৌদ্দগ্রাম, ফেনী, ঢাকা—কোথায় নেইনি! ৭টা হাসপাতাল ঘুরেও আমার মানিকটাকে বাঁচাতে পারলাম না। আমার বুকটা চিরকালের জন্য খালি হয়ে গেল। অন্যদিকে মা সুলতানা আক্তার সন্তানের রেখে যাওয়া ছোট ছোট জামাকাপড় বুকে জড়িয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। শূন্য খাট আর খেলনাগুলো যেন নির্বাক দাঁড়িয়ে প্রতিটি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে—সাজিদ আর কোনোদিন ফিরবে না।
এই বিষয়ে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রশিদ আহমেদ তোফায়েল জানান, হাম রোগের স্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে সাজিদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছিল। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তার অবস্থার অবনতি হতে দেখলে উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যুর খবর আমরা পেয়েছি।

মাহফুজ নান্টু, কুমিল্লা