জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় অন্তত ১৪টি ভুয়া মামলা হয়েছে : পিবিআই
গুলিবিদ্ধ হওয়ার মিথ্যা দাবি, জীবিত মানুষকেও মৃত দেখানোসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনা হিসেবে দায়ের করা অন্তত ১৪টি ভুয়া মামলার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)৷ ডয়চে ভেলের কন্টেন্ট পার্টনার দ্য ডেইলি স্টারের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য৷
পিবিআই-এর এক তদন্তে দেখা গেছে, দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে গুলি করা হয়েছে– এমন অভিযোগে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন ওই শিক্ষার্থীর মা৷ কিন্তু তদন্ত করে জানা যায়, অন্য এক জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল ওই শিক্ষার্থী৷
আরেকটি মামলায় এক জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়৷ মামলায় দাবি করা হয়, অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ২০ বছর বয়সি এক তরুণ নিহত হয়েছেন৷ কিন্তু পিবিআইয়ের তদন্তে দেখা যায়, তিনি বেঁচে আছেন৷
এই দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়৷ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সারা দেশের আদালতে হওয়া ১৯৫টি সিআর (কমপ্লেইন্ট রেজিস্টার) মামলার তদন্ত করতে গিয়ে অন্তত ১৪টি ভুয়া মামলার প্রমাণ পেয়েছে পিবিআই৷
পিবিআই সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া মামলা করার পেছনে পূর্বশত্রুতা থেকে শুরু করে পারিবারিক বিরোধের মতো উদ্দেশ্য ছিল৷ ১৪টি ভুয়া মামলার মধ্যে ১০টি হত্যাচেষ্টা, তিনটি হামলা ও শারীরিক নির্যাতন এবং একটি হত্যার অভিযোগে করা হয়৷ এ ছাড়া আরো ১০টি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি৷
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) মো. আবু ইউসুফ বলেন, ‘‘আমরা বারবার অভিযোগগুলো যাচাই করে দেখেছি, কিন্তু কোনো প্রমাণ পাইনি৷ এসব মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের অব্যাহতি দিতে আদালতে আবেদন করা হয়েছে৷”
১৯৫টি সিআর মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১১৩টির তদন্ত শেষ করেছে পিবিআই৷ এর মধ্যে ৮৯টি মামলার সত্যতা মিলেছে৷ সেগুলোর ৯টি হত্যা ও বাকিগুলো হত্যাচেষ্টার মতো অপরাধ৷
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ৮৯টি মামলায় মোট ৬ হাজার ৮৪৪ জনকে আসামি করা হয়েছিল৷ কিন্তু তদন্ত শেষে মাত্র ১ হাজার ৩৪৩ জনের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেছে৷
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “ভুয়া মামলার আসামিরা প্রায়ই হয়রানির মুখে পড়েন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন৷ তাদের ক্ষতিপূরণ হয়তো আমরা দিতে পারব না৷ তবে দণ্ডবিধির ২১১ ধারার অধীনে আমরা ভুয়া মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করতে পারি৷ জুলাই অভ্যুত্থানসংক্রান্ত মামলাগুলোতে পুলিশ এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে৷”
মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের শাস্তির বিষয়ে দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ মিথ্যা ফৌজদারি মামলা করলে তার দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে৷ আর মিথ্যা অভিযোগটি যদি গুরুতর অপরাধের হয়, তবে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে৷
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায় চলতি বছরের ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৮৫৫টি মামলা হয়েছে৷ এসব মামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ হাজার হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে৷ মামলাগুলো পিবিআইসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট তদন্ত করছে৷
বাইক দুর্ঘটনা অথচ গুলির দাবি
শিহাবের মা ফাতেমা আক্তার পারুল গত বছরের ২১ নভেম্বর একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেন৷ মামলায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাসহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়৷
মামলার এজাহারে তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের গেটের সামনে আসামিরা গুলি ও ককটেল ছুড়লে তার ছেলে শিহাব গুরুতর আহত হয়৷
কিন্তু পিবিআইয়ের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন শিহাবের মোটরসাইকেলের সঙ্গে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষ হয়েছিল৷ আর সেই ঘটনাটি ঘটেছিল অন্য একটি জায়গায় এবং ভিন্ন সময়ে৷ প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে পিবিআই এই তথ্য নিশ্চিত করেছে৷
এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হাসপাতাল থেকে পাওয়া চিকিৎসা নথিতেও শিহাবের গায়ে কোনো আগ্নেয়াস্ত্রের আঘাতের প্রমাণ মেলেনি৷ তবে তদন্তকারীরা নিশ্চিত করেছেন যে, শিহাব গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন৷
পিবিআই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল৷ পরে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা ইউসুফ আহমদ জনি ৩৩ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন, যার মধ্যে ইয়াকুব আলী নামের এক আওয়ামী লীগ নেতার নামও ছিল৷ এই ইয়াকুব আলী হলেন শিহাবের মা পারুলের চাচাশ্বশুর৷
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই মামলার পাল্টা জবাব হিসেবেই পারুল ছাত্রদল নেতা ও অন্যদের বিরুদ্ধে এই মিথ্যা মামলাটি করেছিলেন৷
মামলার এজাহারে দেওয়া ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে পারুলের স্বামী শরীফ উদ্দিন দাবি করেন, তার ছেলে সরকারি গেজেটভুক্ত একজন ‘জুলাই যোদ্ধা’ এবং সে ওই অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল৷ ছেলের আঘাত মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার কারণে হয়েছিল—পিবিআইয়ের এমন দাবি তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা এই তদন্ত প্রতিবেদনকে চ্যালেঞ্জ করবো৷”
জীবিতকে মৃত দেখিয়ে মামলা
রাজধানীর উত্তরায় ২০ বছর বয়সী এক যুবকের হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই দেখে, ওই যুবক বেঁচে আছেন৷
ওই যুবকের মা পারুল খাতুন (৪৫) গত বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন৷ মামলায় শতাধিক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ ২৫৭ জনকে আসামি করা হয়৷
মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরায় আজমপুরে ছাত্রদের মিছিলে তার ছেলে মো. কাওসার মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এবং তার লাশ কখনোই পাওয়া যায়নি৷
কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা অনুসন্ধান করে জানতে পারেন যে কাওসার বেঁচে আছেন৷ এমনকি চলতি বছরের ২ জুন ডাকাতির প্রস্তুতির একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল৷
আইনব্যবস্থার অপব্যবহার
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, এ ধরনের মিথ্যা মামলা দায়েরের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক৷ ৫ আগস্টের পর একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে এই মামলাগুলোকে ব্যবহার করছে৷
গুমবিষয়ক তদন্ত কমিশনের সাবেক এই সদস্য বলেন, ‘‘এসব মামলার এজাহারে যাদের কোনোভাবেই যুক্ত থাকার কথা নয়, এমন পেশাজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীদের টার্গেট করা হয়েছে৷ এটি আইনি ব্যবস্থার চরম অপব্যবহার৷ যারা এ ধরনের ভুয়া মামলা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত৷”

ডয়চে ভেলে