‘বাঁচিয়ে রাখতে গুমের ৭ বছর পর রুমে লাগানো হয়েছিল এসি’
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার শাসনামলে গুমের শিকার হওয়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেছেন, গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে গুমের প্রায় সাত বছর পর ২১ ফুটের সেই কক্ষে এসি লাগানো হয়েছিল। আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিপক্ষের জেরায় তিনি এ কথা বলেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে আজ জেরা করেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, শাইখ মাহদী, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।
জেরায় আইনজীবী আজিজুর রহমানের প্রশ্নে আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, চাকরি থেকে বরখাস্ত আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন করেছিলেন তিনি। ওই রিটে ডিভিশন বেঞ্চ থেকে রুল ইস্যু করা হয়। পরবর্তীতে একক বেঞ্চে রুলের শুনানি শেষে রিট আবেদনটি খারিজ করে দেওয়া হয়।
আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, আমার চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন সেনাপ্রধানের ডেপুটি মিলিটারি সেক্রেটারি। বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে অবসর দেওয়ার আদেশে কে স্বাক্ষর করেছেন তা মনে নেই। বরখাস্তের আদেশ বাতিলের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে কোনো আবেদনও করিনি।
জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারের (জেআইসি) গুম অবস্থা থেকে মুক্তির পর ‘কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে’ জবানবন্দি দিয়েছিলেন কি না, আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলুর এমন প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেন আবদুল্লাহিল আমান আযমী। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের শেষের দিকে এ জবানবন্দি দিয়েছিলাম। কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে কার কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা আমার জানা নেই।
গুমের শিকার হওয়ায় আবদুল্লাহিল আমান আযমী সেনাবাহিনী থেকে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন বলে দাবি করেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু। জবাবে আবদুল্লাহিল আমান আযমী দাবি করেন, এমন কোনো ক্ষতিপূরণ তিনি পাননি।
এ সময় গুমের পর আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে যে কক্ষে রাখা হয়, সেটির বর্ণনা জানতে চান আসামিপক্ষের আইনজীবী। একই সঙ্গে তাকে এসি কক্ষে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করেন আইনজীবী।
প্রত্যুত্তরে সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, আমাকে যে কক্ষে বন্দি রাখা হয়েছিল, তার বর্ণনা আমি কোর্ট অব ইনকোয়ারিতে দিয়েছি। ওই কক্ষের আয়তন ২১ থেকে ১৭ ফুট ছিল। এসি লাগানো হয়েছিল ২০২৩ সালের ৮ জুন।
এ বর্ণনা দিতে গিয়ে আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, ২০২৩ সালের ৬ জুন আমি মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিলাম। গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে আমার রুমে এসি লাগানো হয়। এর আগে প্রায় সাত বছর এসি-বিহীন কক্ষে ছিলাম। তারা বলত, আপনাকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
চাকরিজীবনে কয়টি ব্রিগেড কমান্ড পেয়েছেন, আইনজীবীর এই প্রশ্নে আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, আমি দুটি ব্রিগেড কমান্ড পেয়েছি। একটি ছিল ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট ৩০৯ পদাতিক ব্রিগেড ও রংপুর অঞ্চলে বীর উত্তম শহীদ মাহবুব সেনানিবাসে ১৬ পদাতিক ব্রিগেড।
গুম হওয়ার দিন আটতলা ভবনের ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাটে ছিলেন বলে জেরায় উল্লেখ করেন আবদুল্লাহিল আমান আযমী। তিনি বলেন, আমি অষ্টম তলার ফ্ল্যাটে থাকলেও ওই দিন ষষ্ঠ তলার একটি খালি ফ্ল্যাটে ছিলাম। ভবনটি আমাদের পারিবারিক। ষষ্ঠতলার কক্ষ থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোর দেখা যায় না। তবে বারান্দা থেকে নিচের সবকিছু দেখা যায়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট আসামি ১৩ জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনজন। তাদেরকে আজ সকালে ঢাকার সেনানিবাসের সাব-জেল থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন—ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তাদের হয়ে আইনি লড়াই করছেন আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু।

নিজস্ব প্রতিবেদক