বজ্রপাতের মতো এসেছে হাম, কোনো প্রস্তুতি ছিল না : স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন, হাম হঠাৎ করে বজ্রপাতের মতো এসেছে, আগের থেকে এর কোনো প্রস্তুতি ছিল না। তবে টিকাদান কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা এবং সিপ্যাপ ও ভেন্টিলেটর সাপোর্ট বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাজধানীর শিশু হাসপাতালে হামজনিত নিউমোনিয়া শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপের ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন।
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘একটি হাসপাতালের অবহেলার কারণে, কমিউনিকেশন গ্যাপের কারণে আমাদের অনেকগুলো সন্তান অকালে ঝরে গেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত মর্মাহত।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে একটা ঘটনায় একটামাত্র ক্যাজুয়ালিটিজ হয়েছিল, সংক্রামকব্যাধী হাসপাতাল, মহাখালীতে। আমরা রাত ১টায় সেখানে গিয়েছিলাম। আমরা সমাধান করতে পেরেছিলাম। সেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যে আইসিইউ ছিল, সেটা ১৮ ঘণ্টার মধ্যে তড়িত গতিতে ডাক্তার-নার্সদের নিয়ে চালু করেছি। যে কারণে সেখানে আর কোনো ক্যাজুয়ালিটিজ হয়নি।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দেখেন, আল্লাহ বিপদ দেন এবং সহযোগিতাও করেন। আপনাদের এই পেশাটাতে যদি অবহেলা থাকে, তাহলে এটা মেডিকেল এথিক্সে সমর্থনযোগ্য নয়। আপনারা অন্ধকার ঘরে একবার চিন্তা করেন, আপনারা কারা? তাহলে আর অবহেলা করবেন না। আমাদের ডাক্তাররা অবহেলা করেনও না। ডাক্তার যা বলেন রোগী তা-ই করেন। একজন রোগী স্রষ্টার পরে চিকিৎসকের কাছে পুরোপুরি নিজেকে সঁপে দেয়। চিকিৎসক যা বলেন, রোগী সেই কাজটাই করেন।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ভেন্টিলেটরের অভাবে আমাদের ৩১টি শিশু মারা গেছে রাজশাহীতে। আমরা জানার পর ২৪ ঘণ্টার ভেতরে ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করেছি। আজকে এখানে দুটি দিয়ে যাচ্ছি, আমার কাছে এখনো তিনটা স্টকে আছে। এগুলো বেসরকারি উদ্যোগে হচ্ছে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ঢাকা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে হামের চিকিৎসায়। রাজশাহী ও মানিকগঞ্জ ভেন্টিলেটর ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স প্রস্তুত রয়েছে।’
বক্তব্যে করোনার সময় চিকিৎসকদের অবদানের কথা তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে পৃথিবীর উন্নত দেশ আমেরিকা, ইতালি, ফ্রান্স এমনকি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে আপনারা সেবা দিয়েছেন ও রোগীদের পাশে ছিলেন। সে সময় রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে আমাদের চিকিৎসক কত নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এভাবে জাতিকে রক্ষা করেছেন। করোনায় আপনাদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
‘সেই ধারাবাহিকতায় এখনো আমাদের চিকিৎসকরা এগিয়ে এসেছেন। এটা লাখ টাকায়ও মিলবে না। এই কাজটা আমি করতে পারবো না। আপনারা পারেন। আপনাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে’—যোগ করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালের পর দেশে এককালীন ডোজের হামের টিকার ক্যাম্পেইন হয়নি। আমরা ৬০৪ কোটি টাকায়, যা করোনাকালীন সময়ে অব্যয়িত ছিল—ওই টাকায় ইউনিসেফ থেকে হামের টিকাসহ অন্যান্য টিকা সংগ্রহ করতে যাচ্ছি। এটা পেতে হয় তো ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।’
এই সময়ের মধ্যে গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমুনাইজেশনের (গ্যাভি) কাছ থেকে বাংলাদেশ দুই কোটি ১৯ লাখ ডোজেস হামের টিকা পাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘টিকা প্রদানের কাজে নিয়োজিত এক হাজার ৩২৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী গত ৯ মাস যাবৎ নির্ধারিত বেতন পাচ্ছেন না। এটা তাদের বড় একটি কষ্ট। আর ২৬ হাজার স্বাস্থ্য সহকারী, ২৫ হাজার স্বাস্থ্য পরিদর্শকের গ্রেডের পরিবর্তনর দরকার। তাদের টাকার কোনো প্রত্যাশা নেই, মর্যাদার জন্য গ্রেডটা তাদের চাওয়া। গত সরকার তাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করেনি। তাদের দাবি আমাদের সম্পূর্ণরূপে আমাদের বিবেচনাধীন।’
স্বাস্থ্যকর্মীদের সংকটের ব্যাপারে অবগত আছেন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, অতি দ্রুত সময়ে আপনাদের সব সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করবো। কিন্তু তার আগে দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আপনাদের সহযোগিতা চাইছি।’

নিজস্ব প্রতিবেদক