গ্রিসে যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের ১০ তরুণের মৃত্যুতে শোকের মাতম
সত্তোরোর্ধ্ব আব্দুল গনি জীবনের শেষ বয়সে এসে নিজের ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চেয়েছিলেন। শেষ নিঃশ্বাস ছাড়ার আগে ছেলের সুখ-শান্তি দেখে যেতে চেয়েছিলেন। অভাব অনটনের সংসারে একটু সুখের আশায় মৃত্যুর ঝুঁকি জেনেও ছেলেকে সৌদি আরব হয়ে লিবিয়ার মৃত্যুপুরি সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পাঠাতে চেয়েছিলেন। ছেলে স্বপ্নের ইউরোপ এখন পুরো পরিবারের দুঃস্বপ্ন হয়ে গেছে।
একটু খাদ্য ও খাবার পানির অভাবে সলিল সমাধি হয়েছে সাগরে। এখন আব্দুল গনি যত দিন বেঁচে থাকবেন হাহাকার আর হতাশা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ এটা যেমন একজন হতভাগ্য বাবার কাছে কষ্টের, তার থেকে বড় কষ্টের সন্তানের লাশটা কাঁধে নিতে পারবেন না। নিজের কলিজারধনকে শেষবার ছুঁতে পারবেন না। এই আক্ষেপ নিয়েই বাকি জীবন শেষ করতে হবে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের যুবক লিবিয়ায় সমুদ্রে প্রাণ হারানো মাওলানা সাজিদুর রহমানের (৩০) বাবা আব্দুল গনির।
সন্তানের মৃত্যুর খবর আব্দুল গনিকে এতটাই আঘাত করেছে যে এখন তিনি ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না।
আব্দুল গনি বলেন, জানুয়ারির ১৫ তারিখ বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছিল। একই গ্রামের ওয়াকিব মিয়ার ছেলে মুজিবের কাছে ছয় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তারা বলেছিল বাকি ছয় লাখ টাকা গ্রিসে গেলে দিতে হবে। পথে তাব নিরাপদ নিশ্চিত করা হবে। সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। ঈদের আগের দিন হোয়াটসঅ্যাপে দুই মিনিট কথা বলেছে সাজিদুর। ফোন করে দোয়া করতে বলেছে। এরপর আর কোনো খবর পাইনি।
আব্দুল গনি আরও বলেন, গতরাতে খবর এলো সে মারা গেছে। সে মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করত।
সাজিদুর রহমানের সঙ্গে এই একই গ্রামের নুরুজ্জামান ময়না (২৫) ও পাশের বাড়ি সাহান জগ্বদল ইউনিয়নের মুজিবুর রহমানও একই নৌকায় প্রাণ হারান।
নুরুজ্জামান ময়না দিরাই বাজারে একটি দোকানের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন।
নুরুজ্জামান ময়নার ভাই আক্তারুজ্জামান বলেন, ১৫ জানুয়ারি গ্রিসে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন। ২২ জানুয়ারি লিবিয়ায় পৌঁছায় এরপর ঈদের আগের দিন ফোনে কথা হয় গেমে উঠবে। গেমে উঠে আমার ভাই প্রাণ হারায়। অথচ তারা নেওয়ার আগে লোভ দেখিয়েছে, ভালো ব্যবস্থা কোনো ঝুঁকি নেই, খাবার-দাবার ভালো। অথচ এই খাবার দাবারের অভাবে আমার ভাই মারা গেছে। মাঝখানে কিছু জটিলতা দেখা দেওয়ায় আমরা নুরুজ্জামানকে ১৮ জানুয়ারি ফিরত আনতে চেয়েছিলাম কিন্তু পরে তারা বলেছে গেম সাকসেসফুলি হবে। কিন্তু আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।
আক্তারুজ্জামান আরও বলেন, আর যাতে কেউ লোভে পড়ে এমন মৃত্যুর ঝুঁকি না নেয়।
কাউধর গ্রামের লিটন মিয়া বলেন, সুনামগঞ্জের ১০ জনের সঙ্গে আজকে আমার ছেলেও লাশ হয়ে যেত। আমরা ঝুঁকি বুঝতে পেরে আমার ছেলেকে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে ফিরিয়ে আনি। আমার ছেলে এখন আমার বুকে আছে।
লিটন মিয়া আরও বলেন, অভিভাবকদের সচেতন হওয়া দরকার। অভিভাবক না চাইলে কারো মায়ের বুক আর খালি হবে না। আর কেউ নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ঝুঁকি নিবে না। সেই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনকেও উদ্যোগ নিতে হবে।
তারাপাশা গ্রামের বাসিন্দা আলী আসকর (৫০) বলেন, গ্রামের অনেকেই দালালের লোভে পড়ে মৃত্যু জেনেও ঝুঁকি নেয়। কিন্তু এক গ্রামের তিনজন মানুষ মারা যাওয়া খুবই মর্মান্তিক। আরও মর্মান্তিক লেগেছে দালালরা তাদের খাবার দেয়নি, পানি দেয়নি। খাদ্য ও পানির অভাবে তারা মারা গেছে।
আলী আসকর বর্তমান সরকারের কাছে দালালদের শাস্তি ও তরুণরা যেন এমন মরণ ঝুঁকি না নেয় সেই উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন।
লিবিয়ার সাগরে গ্রিসে যাওয়ার পথে খাবার ও পানির অভাবে সুনামগঞ্জের যে ১০ জন মারা যান তাদের পরিবার, প্রতিবেশী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এ পর্যন্ত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
তাঁরা হলেন দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গনির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫) ও একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম, জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান ও ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী।
পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন বলেন, সুনামগঞ্জের ১০ জন নিহত হওয়ার খবর আমরাও জেনেছি, তবে সরকারি কোনো দপ্তর নিশ্চিত না করায় সঠিক ভাবে বলা যাচ্ছে না। আমরা ভালো করে যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হয়ে সঠিক তথ্য জানাব।

দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী, সুনামগঞ্জ