ফার্মাসিস্ট হয়েও ‘ডাক্তার’ সেজে চিকিৎসা দিচ্ছেন উত্তম কুমার
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ধুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা উত্তম কুমার রায়। চিকিৎসাবিদ্যায় কখনও অধ্যয়ন করেননি, নেই কোনো চিকিৎসা সনদ। তারপরও নিজেকে পরিচয় দেন চিকিৎসক হিসেবে। চিকিৎসাপত্রে তার নামের আগে লিখেন ‘ডাক্তার’ এবং সাধারণ মানুষের কাছে জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা দেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসা সনদ বা অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও উত্তম কুমার দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন। উত্তম কুমারের ধুলিয়া বাজারের উৎসব মেডিসিন কর্নার নামের একটি ওষুধের দোকান রয়েছে। সেখানে তিনি প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত রোগী দেখেন।
স্থানীয় সূত্র এবং সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, উত্তম কুমার শিক্ষাজীবনে মাত্র উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে ধুলিয়া বাজারে একটি ওষুধের দোকান খোলেন। পরে ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেন। তার চিকিৎসাপত্রে নামের নিচে লেখা আছে- ‘অলটারনেটিভ মেডিসিন (কলকাতা)’ ও ‘ডিপ্লোমা ইন ফার্মাসিস্ট (ঢাকা)।’
তবে নিয়ম অনুযায়ী একজন এমবিবিএস সদনধারী চিকিৎসকই বিএমডিসির অনুমোদন নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে পারেন। এছাড়াও উপসহকারী মেডিকেল অফিসাররা সীমিত প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন। কিন্তু উত্তম কুমার চিকিৎসা অনুষদে কখনও পড়াশোনা করেননি। এমনকি প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য দেশের অনুমোদিত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে সল্প মেয়াদি কোনো কোর্সও সম্পন্ন করেননি।
তারপরও তিনি সব জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা দেন। নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেন। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করে চলেছেন।
স্থানীয় ভুক্তভোগী রাকিবুল ইসলাম জানান, সামান্য জ্বর ও ঠান্ডা নিয়ে তিনি উত্তম কুমারের কাছে যান। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ১ হাজার ৫০০ টাকার এন্টিবায়োটিক ওষুধ দেন। ওই ওষুধ খেয়ে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
আরেক ভুক্তভোগী সঞ্জয় জানান, গ্রামের সাধারণ মানুষরা না বুঝে তার কাছে চিকিৎসা নিতে যায়। ভুয়া চিকিৎসক উত্তম সাধারণ মানুষদের জিম্মি করে হাজার হাজার টাকার ওষুধ লিখিয়ে দেন। এতে গ্রামের গরিব ও অসহায় মানুষদের প্রতারণা এবং আর্থিক ক্ষতি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী শাকিল গাজী বলেন, উত্তম কুমারের চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোনো জ্ঞান নেই। কোনো পড়াশোনা করেননি। তারপরও নিজেকে চিকিৎসক দাবি করে প্রতারণা করছেন। তার ভুল চিকিৎসার কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। পরে একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের কাছে গিয়ে সঠিক চিকিৎসা নিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী কাওসার আহমেদ বলেন, উত্তম কুমার প্রথমে ওষুধ ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে রাতারাতি ডাক্তার হয়ে গেলেন। চিকিৎসা সেবা একটি স্পর্শকাতর বিষয়। সেখানে একজন মাধ্যমিক পাশ মানুষ কীভাবে জটিল রোগের চিকিৎসা দিচ্ছেন, তা অনুধাবন করা কঠিন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তম কুমার বলেন, আমি কলকাতা থেকে অল্টারনেটিভ মেডিসিন ও ফার্মাসিস্ট কোর্স সম্পন্ন করেছি। আমার ড্রাগসের লাইসেন্স আছে। আমি প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারি।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ এবং নামের আগে ‘ডাক্তার’ লেখা যাবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে উত্তম কুমার বলেন, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন, সেখানেই তা প্রয়োগ করি। আর নামের আগে ‘ডাক্তার’ শব্দটি মুছে ফেলব।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আবদুর রউফ বলেন, ফার্মাসিস্ট হয়ে নিজেকে চিকিৎসক পরিচয় দেওয়ার বা চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এন্টিবায়োটিক প্রয়োগের তো প্রশ্নই আসে না। উত্তম কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পটুয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে নিবন্ধনবিহীন ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হবে।

এম.এ হান্নান, পটুয়াখালী (বাউফল-দুমকি)