‘স্কুল ফিডিং’-এ এবার কি মিলবে মানসম্মত খাবার?
বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এবং ঝরে পড়া ঠেকাতে চালু হওয়া ‘স্কুল ফিডিং’কর্মসূচি নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে৷ এসব খাবারে পচা ডিম, বাসি রুটি, মেয়াদোত্তীর্ণ দুধ, নষ্ট কলা দেওয়ার অভিযোগ অনেক দিনের৷ বর্তমানে ১৫০টি উপজেলায় এই কর্মসূচি চালু রয়েছে৷ আগামী জুন-জুলাইয়ে এই কর্মসূচি সারাদেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে নতুন বিএনপি সরকার৷ এবার কি মিলবে মানসম্মত খাবার?
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ডয়চে ভেলেকে (ডিডাব্লিউ) বলেন, ‘‘স্কুল ফিডিং শুধু একটি খাবার কর্মসূচি নয়, এটি শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং তাদের বিদ্যালয়ে আসতে উৎসাহিত করার একটি বড় উদ্যোগ৷ আমরা চাই দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী এর সুফল পাক৷”
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘জুন-জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে সব উপজেলাকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে৷ পাশাপাশি এই খাবার পুষ্টিমান কীভাবে আরও উন্নত করার যায়, সেই চেষ্টাও হচ্ছে৷ বর্তমানে যে খাবার দেওয়া হয়, সেটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট মিলে ঠিক করেছে৷ এবারও তাদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে ওই খাবারগুলো নিয়ে রিভিউ করার জন্য৷ একই সঙ্গে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে মনিটরিং করা হবে, খাবারের মান যাতে ঠিক থাকে৷”
বর্তমানে বিতরণ করা খাদ্যতালিকা
সপ্তাহের পাঁচ কর্মদিবসেই শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় ফর্টিফাইড বিস্কুট, কলা বা মৌসুমি ফল, বনরুটি, ডিম এবং ইউএইচটি দুধ৷ নির্ধারিত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী প্রতি রোববার বনরুটির সঙ্গে সেদ্ধ ডিম, সোমবার বনরুটি ও ২০০ গ্রাম ইউএইচটি দুধ, মঙ্গলবার ৭৫ গ্রামের ফর্টিফাইড বিস্কুট ও ফল এবং বুধবার ও বৃহস্পতিবার বনরুটির সঙ্গে সেদ্ধ ডিম দেওয়া হয়৷ এই বিশেষ খাদ্যতালিকা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় মোট এনার্জির ২৫ দশমিক নয় শতাংশ, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ৩২ দশমিক দুই শতাংশ, প্রোটিনের ১৬ দশমিক চার শতাংশ এবং ফ্যাটের ২১ দশমিক সাত শতাংশ পূরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়৷
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান প্রকল্পের আওতায় ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের নির্বাচিত ১৫০টি উপজেলার ১৯ হাজার ৪১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ লাখ ১৩ হাজার শিক্ষার্থীকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে৷
খাবার সরবরাহ ব্যবস্থা তিনটি অংশে টেন্ডারের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও টেন্ডার জট ও আইনি মামলার কারণে বর্তমান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে৷ ২০টি জোনের মধ্যে ১২টিতে যোগ্য সরবরাহকারী না পাওয়া এবং বিস্কুট সরবরাহ নিয়ে সাতটি বিভাগে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান থাকায় নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না৷ বিস্কুট সরবরাহের বিষয়টি বর্তমানে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির শুনানিতে রয়েছে, যা নিষ্পত্তি হলেই কেবল নিয়মিত সরবরাহ ফিরবে৷
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমরা শুরু থেকে বলে আসছি, শিশুদের গরম খাবার দিতে হবে৷ কিন্তু স্কুলগুলোর ব্যবস্থাপনার কারণে সেটা দেওয়া হচ্ছে না৷ এখন যে খাবার দেওয়া হয়, সেটাও যদি মান নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পুষ্টির অনেকখানি পূরণ সম্ভব৷”
এ জন্য স্থানীয় মানুষদের এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দিয়ে ড. নাজমা শাহীন বলেন, ‘‘শুধু ঠিকাদারের উপর ভরসা করলে হবে না৷ আমরা কিছুদিন আগে গার্মেন্টস কর্মীদের টিফিনের জন্য একটি খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করেছি৷ সেখানেও কিছু গরম খাবার এবং খাবারের মানের কথা বলা হয়েছে৷ আমাদের সময় এসেছে পাইলটিং প্রজেক্ট থেকে সরে এসে খাবারের তালিকা চূড়ান্ত করা৷ একই সঙ্গে কঠোরভাবে মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে৷”
খাবারের মান নিয়ে তবুও রয়েছে প্রশ্ন
স্কুলে শিশুদের যে খাবার দেওয়া হচ্ছে, তার মান নিয়ে প্রশ্ন অনেকদিনের৷ ডিডাব্লিউ পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছে৷ এর মধ্যে একজন খাবার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি৷ তিনি জানিয়েছেন, ‘‘একদিন আমার স্কুলে আসা রুটির প্যাকেটে উৎপাদনের তারিখ লেখা ছিল ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, অথচ সেদিন ছিল ২৫ জানুয়ারি৷ ভবিষ্যতের তারিখ দুই দিন আগেই কীভাবে লেখা থাকে, তা দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়েছি৷”
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার ঘাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিপ্লব চন্দ্র সরকার ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমার স্কুলে এই ধরনের কোনো কর্মসূচি এতদিন ছিল না৷ দুই মাস আগে এই কর্মসূচি আংশিকভাবে চালু হয়েছে৷ শুধু সোমবার শিশুদের ২০০ গ্রাম ওজনের একটি দুধের প্যাকেট দেওয়া হয়৷ এর বাইরে আর কিছু দেওয়া হয় না৷ তবে শুনেছি, আগামী মাস থেকে সপ্তাহে পাঁচ দিনই রুটি, ডিম, কলা, দুধ দেওয়া হবে৷”
এছাড়া মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার বুনাগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অলিফ কুমার বিশ্বাস, সুনামগঞ্জ সদরের ঝরঝরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রহিম এবং সুনামগঞ্জ সদরের দেওয়ান নগর মোহনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমিয় চন্দ্র দে ডিডাব্লিউকে জানিয়েছেন, তাদের স্কুলে এই ধরনের কোনো কর্মসূচি কখনই চালু হয়নি৷ ভবিষ্যতে হবে কিনা তারা জানেন না৷
খাবারের মানের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মোহাম্মদ শামসুজ্জামান ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘শুধু মুখে অভিযোগ করলে তো হবে না৷ আমরা সবাইকে বলেছি, একটু সুনির্দিষ্ট করে আমাদের বলেন৷ এক্ষেত্রে আমাদের জিরো টলারেন্স৷ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷ কিন্তু সমস্যা হলো কেউ নির্দিষ্ট করে বলে না৷ শুধু ভাসা ভাসা অভিযোগ করে৷ আমরা সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নিতে পারি৷ আমরা চাই, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নির্ধারিত সব খাবার যেন সময়মতো হাতে পায়৷ প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন কোনোভাবেই মেয়াদোত্তীর্ণ দুধ, কম ওজনের পাউরুটি বা পচা ফল গ্রহণ করা না হয়৷ প্রয়োজনে তারা আমাদের বিষয়টি জানাবে৷ শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রে সরকার ‘জিরো টলারেন্স' নীতি অনুসরণ করছে এবং যেকোনো অনিয়মে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷”
আইনি জটিলতায় খাবার যাচ্ছে না
জানা গেছে, স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার সরবরাহ কার্যক্রমকে তিনটি আলাদা অংশে ভাগ করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়৷ ইউএইচটি দুধ, ফর্টিফাইড বিস্কুট ও ‘ফুড বাস্কেট’ (বনরুটি, ডিম ও ফল)৷ ফুড বাস্কেট সরবরাহের জন্য পুরো দেশকে ২০টি জোনে ভাগ করা হলেও, প্রথম দফায় মাত্র আটটি লটে যোগ্য সরবরাহকারী পাওয়া যায়৷ বাকি ১২টি লটের জন্য পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করে সরবরাহকারী নিশ্চিত করা হয়েছে৷ দুধ সরবরাহের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়৷ আটটি বিভাগের মধ্যে প্রথম দফায় চারটি বিভাগে সরবরাহকারী পাওয়া গেলেও বাকি চারটির জন্য পুনরায় ই-টেন্ডার করতে হয়েছে৷ অন্যদিকে, ফর্টিফাইড বিস্কুট সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে আইনি জটিলতা৷ সাতটি বিভাগ নিয়ে আদালতে মামলা হওয়ায় বিষয়টি বর্তমানে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষ ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি’র শুনানিতে রয়েছে৷ সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই আইনি সংকট দ্রুত নিষ্পত্তি হলে সব খাবার নিয়মিত সরবরাহ করা সম্ভব হবে৷
অনিয়ম ঠেকাতে সরকার শিশুদের খাবারের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে৷ পরিবহণ সমস্যা কমাতে স্থানীয়ভাবে ডিম ও ফল সংগ্রহের পরিকল্পনাও রয়েছে৷ বর্তমানের ১৫০টি উপজেলার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আগামী জুন-জুলাই মাস থেকে ধাপে ধাপে দেশের প্রতিটি উপজেলায় এই কর্মসূচি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি-৫) চূড়ান্ত করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়৷ বর্তমানে ডিপিপি-৪ এর আওতায় খাবার দেওয়া হচ্ছে৷
স্কুল ফিডিং চালু হয় কবে?
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত স্কুল শিশুদের খাওয়ানোর জন্য প্রকল্প চালিয়েছিল৷ সর্বশেষ ২০১০ সালে সরকারি স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছিল৷ এ কর্মসূচির আওতায় সরকার ১০৪ উপজেলার প্রায় ৩০ লাখ স্কুলশিক্ষার্থীকে ৭৫ গ্রাম ফর্টিফাইড বিস্কুট দিয়েছে৷ প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বেড়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ ও ঝরে পড়ার হার কমেছে ছয় শতাংশ৷
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, ২০১০ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩৯ দশমিক আট শতাংশ৷ ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশে৷ ২০২২ সালে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব ডিপিপি-৪ চূড়ান্ত করে সরকার৷ এটা চলবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত৷ এই প্রকল্পে সারা দেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল কার্যক্রম চালু করে সরকার৷ সপ্তাহে তিন দিন রান্না করা খাবার এবং তিন দিন বিস্কুট দেওয়া হয়৷ নানা বিতর্কের মধ্যে পরে তা সংশোধন করে রান্না করা খাবার বাদ দেওয়া হয়৷ পাশাপাশি আইনি জটিলতায় সব স্কুলেও এই কর্মসূচি চালু করা যায়নি৷ এবার নতুন সরকার জুন-জুলাই থেকে সারাদেশের সবগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই কর্মসূচি চালু উদ্যোগ নিয়েছে৷

ডয়চে ভেলে