নতুন বাংলাদেশে গণতন্ত্রে ফেরার ভোট আজ
চব্বিশের রক্তঝরা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য। দীর্ঘ দেড় দশকের রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ কাটিয়ে কথা বলার স্বাধীনতা আর ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে বিভোর পুরো দেশ। যে রাজপথে ঝরেছে বিপ্লবীদের রক্ত, সেই রাজপথে এখন মুক্তকণ্ঠের নির্বাচনি আমেজ। আজকের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কেবল ভোটই নয়, বরং এটি নতুন প্রজন্মের লড়াইয়ের ফসল—যেখানে মানুষ কোনো ভয় ছাড়াই নিজের পছন্দের নেতা বেছে নেওয়ার অধিকার ফিরে পাচ্ছে। ভয়হীন পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের এই নতুন চর্চা বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে এক নতুন গণতান্ত্রিক দিগন্তের দিকে। তবে এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন, এক ঐতিহাসিক ‘গণভোট’।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তবর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই নির্বাচন।
বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে অভিহিত করছেন বিশ্বের প্রথম ‘জেন-জি’ অনুপ্রাণিত নির্বাচন হিসেবে। প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এই নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম।
আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত শেরপুর-৩ আসন বাদে সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। কয়েকটি স্তরে ভোটের নিরাপত্তায় আছে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লাখ ৫৬ হাজার সদস্য।
এক নজরে নির্বাচনের পরিবেশ
বিগত নির্বাচনগুলোতে রাজপথে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি দেখা গেলেও এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় মাঠে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। যদিও সর্বমোট ৫০টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
বিএনপি এককভাবে ২৯২টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জয়ের ব্যাপারে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়েছে ১০টি দল।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্যজোট বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ ও তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ায় ভোটের সমীকরণে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন।
একইসঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট
এবারের ভোটের সবচেয়ে বড় চমক ব্যালট বাক্সে দুটি ভিন্ন লড়াই। একদিকে সংসদ সদস্য নির্বাচন, অন্যদিকে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা এবং নির্বাচনকালীন স্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভোটাররা তাদের রায় দেবেন।
ফ্যাক্টর যখন ‘জেন-জি’
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, মোট ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশই তরুণ প্রজন্ম। ২০২৪ সালের বিপ্লবের মূল কারিগর এই তরুণরাই এবার ভোটের ভাগ্য নির্ধারণ করবেন বলে মনে করা হচ্ছে। ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকার তরুণ ভোটার মোহাম্মদ রাকিব বলেন, আমরা এমন একটি সরকার চাই, যারা আমাদের কথা বলতে দেবে এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়বে।
ভোটের ময়দানে উৎসব বনাম শঙ্কা
গত ১৫ বছর ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ দূর করতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলো থেকে গ্রামে ছুটে গেছেন বিপুল মানুষ। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সবার মাঝে।
এবারের মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।
ভোটের সর্ববৃহৎ এই উৎসবের মধ্যেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। অধিকাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং যোগ্য নেতৃত্বকেই অগ্রাধিকার দেবেন।
প্রবাসীদের ভোট
এবারের সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিতে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের পাঠানো ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৮৫টি ব্যালট দেশে এসে পৌঁছেছে।
অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনকারী প্রবাসীদের কাছে মোট ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২টি ব্যালট পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫৭৯ জন ব্যালট গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে ভোট দিয়েছেন ৫ লাখ ১৫ হাজার ৬১৯ জন।
কারাবন্দিদের ভোট
দেশের ৭৫টি কারাগারে থাকা প্রায় ৮৬ হাজার বন্দির মধ্যে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ৫৯৯০ জন নিবন্ধন করেছিলেন। নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ত্রুটির কারণে ৩৮০টি আবেদন বাতিল হয়। ফলে পাঁচ হাজার ৬১০ জন ভোটদানের যোগ্য হন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৬৭ জন কারাবন্দি ভোট দেন, আর নিবন্ধিত ৫৪৩ জন ভোট দেননি। নিবন্ধিতদের মধ্যে ৬০ জন ‘গুরুত্বপূর্ণ‘ বন্দি রয়েছেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের মধ্যে ৫৬ জন ভোট দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি শিক্ষকদের ভোটদানের সুযোগ
এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে কয়েক লাখ সরকারি-বেসরকারি শিক্ষক, ব্যাংকার নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করছেন। তারমধ্যে সরকারি চাকুরিজীবীরা অ্যাপসের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
নির্বাচনে ইসির পদক্ষেপ
গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। গত ২২ জানুয়ারি শুরু হওয়া নির্বাচনি প্রচার শেষ হয়েছে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায়। এবার ভোট গ্রহণ হবে আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে টানা বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।
শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে ইসি এই আসনের নির্বাচন বাতিল করেছে। এ কারণে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সর্বনিম্ন ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে— ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। আর সর্বোচ্চ ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন ভোটার আছে গাজীপুর-২ আসনে।
এবারের নির্বাচনে মোট ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। মোট প্রার্থী ২০২৮ জন। ঢাকা-১২ আসনে সবচেয়ে বেশি ১৫ জন প্রার্থী। আর পিরোজপুর-১ আসনে সবচেয়ে কম- মাত্র ২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, সারা দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ থাকবে। এবার নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবে প্রায় ৮ লাখ কর্মকর্তা। আর নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ৫৬ হাজার সদস্য নিয়োজিত থাকবে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তথ্য অনুসারে, ২৯৯টি আসনের মধ্যে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী রয়েছেন ২৯১ জন। অন্য ৯টি আসনে ধানের শীষের বাইরে নিজস্ব প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বিএনপি জোটের প্রার্থীরা। অন্যদিকে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক রয়েছে ২২৭টি আসনে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট ইসি
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে বিরাজমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন সন্তুষ্ট। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা না ঘটলে পরিবেশ আরও সুসংহত হতো।
ইসি সানাউল্লাহ আরও বলেন, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেন্দ্রের চৌহদ্দির মধ্যে ভোটার উপস্থিত থাকলে তাদেরও ভোট গ্রহণ করা হবে। এ নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে সারা দেশে ৮৫০টির বেশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতার প্রমাণ।
ভোট গণনা ও ফলাফল
নির্বাচন কমিশনের হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুটি ব্যালট একই সঙ্গে গণনা করা হবে। কেন্দ্র পর্যায়ে প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর তা রিটার্নিং অফিসারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। বেশিরভাগ আসনের ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা করছে কমিশন।
নির্বাচন নিয়ে শেখ হাসিনার প্রহসন
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ জোট। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে নানা টালবাহানায় বিভিন্ন উপায়ে পার করেন টানা সাড়ে ১৫ বছর। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনটি ছিল সম্পূর্ণ বিনাভোটে নির্বাচন। এই নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচনটি ছিল ‘রাতের ভোট’। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট রাতেই কাস্ট করা হয়। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির হার দেখানো হয়েছিল ১০০ শতাংশের বেশি এবং সে সব ভোট শুধু ‘নৌকা’ প্রতীকেই পড়েছিল।
২০২৪ সালে ছিল ‘ডামি নির্বাচন’। এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় জনগণের কাছে প্রতিযোগিতামূলক দেখানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের ‘ডামি প্রার্থী’ দাঁড় করানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল।

নিজস্ব প্রতিবেদক