র্যাব-ডিজিএফআই বিলুপ্ত করে নতুন সংস্থার দাবি সাবেক সেনাপ্রধানের
র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) বিলুপ্ত করে নতুন নামে সংস্থা করার দাবি জানিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় দিনের সাক্ষীর জবানবন্দিতে তিনি এ দাবি করেন।
ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দীতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিসে আসা-যাওয়া করতো।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক গুম ও খুনের অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিচ্ছেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
প্রথম দিনের জবানবন্দীতে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল। গুমের সংস্কৃতি পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে।
সাবেক এ সেনাপ্রধান বলেন, সেনাবাহিনীকে কখনও বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে যখন র্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনা সদস্যদের যে প্রশিক্ষণ, তা র্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না।
জবানবন্দীতে তিনি আরও বলেন, ২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর জন্য যে সংঘাত শুরু হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে স্টেট অব ইমার্জেন্সি (জরুরি অবস্থা) ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই হয়ে উঠে দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক। বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে তাদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করত। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। তারা বিএনপির তারেক রহমানকেও উঠিয়ে এনে নির্যাতন করে।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, এ সময় থেকে বস্তুত বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে আটক রাখার সেলের মধ্যে রাখা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। বস্তুত যেকোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা ইচ্ছা তাই করা যায় মর্মে তারা ভাবতে শুরু করে। তারা ভাবতে শুরু করে, যা কিছুই তারা করুক—শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে। জরুরি অবস্থায় সেনা সদস্যদের সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। তারা রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের মধ্যে আধিপত্যবোধের জন্ম হয়, সিনিয়র ও জুনিয়রের মধ্যে একটি বিভাজন সৃষ্টি হয়, নগদ সংস্কৃতির উত্থান হয় এবং উপরস্থদের আদেশ অন্ধভাবে পালন করার প্রবণতার জন্ম হয়।’
ইকবাল করিম ভূঁইয়া সাক্ষীর জবানবন্দিতে আরও বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনা অফিসারদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্রতর হয়, সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে, পেশাদার অফিসারদের একপাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের উপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করে বাহিনীটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। এর বড় কারণ হলো শেখ হাসিনা ভাবতেন, একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।
গত ১৪ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেন এবং রোববার দিনটি সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নির্ধারণ করেন।
এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আদালতে উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, গুম কমিশনের প্রতিবেদনসহ মামলার অভিযোগ প্রমাণে প্রয়োজনীয় সব উপাদান আদালতে উপস্থাপন করা হবে। পরে ট্রাইব্যুনাল অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক