গৃহকর্ত্রীকে ‘মা’ ডেকেও রক্ষা পায়নি মোহনা, করা হতো পাশবিক নির্যাতন
গৃহকর্ত্রীকে মা বলে ডাকলেও তার মন গলাতে পারেনি ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী মোহনা। দীর্ঘদিন ধরে বাথরুমে আটকে রেখে নিয়মিতভাবে তার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হতো বলে অভিযোগ করেছে নির্যাতিত শিশু। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মোহনার শরীরের আঘাতগুলো দীর্ঘমেয়াদি এবং পরিকল্পিত নির্যাতনের স্পষ্ট আলামত বহন করে। রাজধানীর উত্তরায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বাসায় ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী মোহনাকে এই নির্যাতন করা হয়।
আজ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ১৫ নম্বর কক্ষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোহনা এসব কথা জানায়। সে জানায়, গৃহকর্ত্রী বিথীকে সে ‘মা’ বলে ডাকতো।
মোহনা বলে, মা (গৃহকর্ত্রী বিথী) আমাকে নির্যাতন করেছে। যখন-তখন মারধর করতো। খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছ্যাঁকা দিত। মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতো। আমাকে কখনও স্যারের (গৃহকর্তা) কাছে যেতে দিত না। সবসময় আমাকে বাথরুমে আটকে রাখতো। খেতে দিত না। পেটে খিদে লাগলেও ভয়ে খাবার চাইতাম না। আমি তার (গৃহকর্ত্রী বিথী) বিচার চাই, তার ফাঁসি চাই।
মোহনা আরও জানায়, গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে বাসার মহিলা বুয়া ও ছেলে বুয়াও তাকে মারধর করতো। তারা নির্যাতন করলেও গৃহকর্ত্রী কখনও বাধা দিত না। নির্যাতনের সময় গৃহকর্তা বাসায় থাকলেও তাকে সামনে যেতে দেওয়া হতো না। গৃহকর্তা বাসায় এলে তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো।
মোহনা বলে, স্যার (সফিকুর রহমান) আমাকে কখনও মারেনি, স্যারের কোনো দোষ নাই।
মোহনা জানায়, সে অল্প অল্প কাজ করতো- বাবুকে দেখাশোনা করতো, তরকারি কেটে দিত, ঘর মোছা-মুছি করতো। কিন্তু কোনো কারণে কাজ না করলে বা বাবুকে দেখতে না পারলে তাকে খুন্তি ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হতো। দিনের পর দিন, এমনকি রাতেও তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো।
মোহনা পঞ্চগড় সদর উপজেলার ফকিরপাড়া গ্রামের হোটেল শ্রমিক গোলাম মোস্তফার মেয়ে। সে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থানার কুদ্দুস নগরের পেয়ারা বাগান এলাকায় বাবার সঙ্গে থাকতো। তিন বছর বয়সে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় ট্রাক ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে তার মা নিহত হন। এরপর কয়েক বছর সে দাদীর কাছে বড় হয়।
মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা জানান, গত কোরবানির ঈদের পর উত্তরা এলাকায় একটি চায়ের দোকানে বসে থাকার সময় উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ৭/সি, ২৬ নম্বর বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পরিচয় হয়। জাহাঙ্গীর জানান, একজন বিমান কর্মকর্তার বাসায় কাজের মেয়ে প্রয়োজন। তিনি মেয়েকে ভালোভাবে রাখবেন বলে আশ্বাস দেন।
গোলাম মোস্তফা বলেন, যেদিন মেয়েকে নিয়ে যাই, দেখি টেবিল ভর্তি খাবার। ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন কন্ট্রাক্ট দেব কি না। আমি বলেছি কন্ট্রাক্ট না, শুধু মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য রেখে যাচ্ছি। তারা রাজি হলে মেয়েকে রেখে আসি। প্রায় আট মাস সেখানে ছিল।
মোস্তফা জানান, গত ৩০ জানুয়ারি গৃহকর্ত্রী ফোন করে মেয়েকে নিয়ে যেতে বলেন। পরদিন গিয়ে মেয়েকে গুরুতর আহত অবস্থায় পান তিনি। গৃহকর্ত্রী দাবি করেন, বাথরুমে পড়ে গিয়ে এসব হয়েছে এবং চুলকানির কারণে ঘা হয়েছে। তাকে কবিরাজের ঠিকানা দিয়ে একটি সাদা কাগজে সই করিয়ে মেয়েকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
গোলাম মোস্তফা বলেন, বাসায় ফেরার পথে আমার মেয়ে শুধু বলছিল- ‘আব্বা, আমি খাব।’ বুঝলাম ওকে না খাইয়ে রাখা হতো। আর কয়েকদিন থাকলে হয়তো আমার মেয়ে মারা যেত। আমি সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
মোহনার দাদি রেজিয়া বলেন, গৃহকর্ত্রী কোনো কাজ করতেন না, অথচ অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করতেন। শুরুতে দেখা করতে দিলেও পরে বাধা দেওয়া হয়। শেষ তিন মাস তাদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি। দারোয়ান ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত। সাদা কাগজে সই করিয়ে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়।
মোহনাকে আট বছর লালন-পালন করা ইসরাফিল বলেন, আমি শুধু চাই, এই ঘটনার এমন বিচার হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো গরিব শিশুর সঙ্গে এমন নির্যাতন না হয়।
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মোহাম্মদ খলিলুর রহমান জানান, মোহনার শরীরের আঘাতগুলো দীর্ঘমেয়াদি। ১০, ১৫ ও ২০ দিন আগের আঘাতের পাশাপাশি এক থেকে দুই মাস আগের আঘাতের চিহ্নও রয়েছে। নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। পুষ্টিকর খাবারও দেওয়া হয়নি।
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী রফিক আহমেদ জানান, শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বিথী এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

নাসির আহমেদ, গাজীপুর