আধিপত্যবাদ মোকাবিলার একমাত্র সমাধান নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি : নাহিদ ইসলাম
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য বিস্তারকারী পরাশক্তিগুলোকে মোকাবিলার একমাত্র সমাধান হচ্ছে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তিনি বলেন, ‘আমরা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি, এটি আমাদের স্লোগান। কিন্তু আমরা কীভাবে আধিপত্যবাদ বিরোধিতা করবো? আমাদের সঙ্গে এতগুলো পরাশক্তি বা যারা বাংলাদেশকে ডমিনেট করতে চায়, সেটার একমাত্র সমাধান হচ্ছে নিজের (দেশের) সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। নিজেকে গঠন করা, নিজের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করাই আমাদের ন্যাশনাল ডিগনিটি (জাতীয় মর্যাদা) বৃদ্ধি করবে।’
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলে আয়োজিত ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শিরোনামে দলের ৩৬ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এনসিপির রুট হচ্ছে গণঅভ্যুত্থান। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই আমাদের দলের নেতৃত্ব ও আদর্শ তৈরি হয়েছে। আমরা শহীদ মিনারে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা স্পষ্ট করে বলেছিলাম। গত ১৬ বছরে বা স্বাধীনতার পর গত ৫০ বছরে এমন এক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যার কারণে আমরা প্রকৃত গণতন্ত্রে কখনো পৌঁছাতে পারি নাই। এই ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে এমন এক বন্দোবস্ত করতে হবে, যা স্বৈরতান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি রোধ করবে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ নিশ্চিত করবে।’
নির্বাচনি জোট ও কৌশল প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘পুরোনো দলের সঙ্গে জোট করার ফলে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন যে, আমরা আমাদের লক্ষ্য থেকে সরে এলাম কি না। আমরা স্পষ্ট করতে চাই, আমরা আমাদের দাবিতে অটল আছি। এই জোটটি মূলত একটি নির্বাচনি ঐক্য। ১১ দলীয় এই নির্বাচনি ঐক্য ন্যূনতম কিছু রাজনৈতিক জায়গায় ঐক্যমতের ভিত্তিতে গঠিত। সরকারের ভেতর আমাদের অংশীদারিত্ব থাকলে আমাদের ইশতেহারের বিষয়গুলো প্রায়োরিটি লিস্টে থাকবে এবং আমরা সেগুলো সরকারের ভেতর থেকে বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাবো।’
এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, ‘আমরা আমাদের এই ইশতেহারের শিরোনাম দিয়েছি, ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’। এর পেছনে দুটি সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রেক্ষাপট রয়েছে। প্রথমত, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণদের যে বিপুল জাগরণ আমরা দেখেছি, জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে তরুণদের শক্তিকে কীভাবে সুগঠিত করে রাষ্ট্রের কাজে লাগানো যায়, সেটাই আগামী দিনের প্রধান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার জায়গা। এ কারণে তারুণ্য আমাদের প্রধান এজেন্ডা।’
নাহিদ বলেন, ‘আমাদের ইশতেহারের দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে ডিগনিটি (মর্যাদা)। বিগত ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ সময়ে আমরা দেখেছি এ দেশের মানুষের নাগরিক মর্যাদা কীভাবে বারবার ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। মানুষ হিসেবে নাগরিকের মানবাধিকার, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়ানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য থেকেই আমরা এই ইশতেহারের নামকরণ করেছি।’
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ‘আমাদের প্রথম ও প্রধান অঙ্গীকার হচ্ছে একটি স্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা। দ্বিতীয়ত হচ্ছে বিচার নিশ্চিত করা। জুলাই গণহত্যাসহ গত ১৬ বছরে সংগঠিত সব হত্যাকাণ্ড, শাপলা ও পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং সকল গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার আমরা সুনিশ্চিত করবো। এই বিচার প্রক্রিয়া হবে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। বিচারের পাশাপাশি আমরা একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন করবো। তবে এই রিকনসিলিয়েশন মানে কোনোভাবেই ফ্যাসিবাদের বা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পুনর্বাসন নয়। বরং এই কমিশনের কাজ হবে সুনির্দিষ্ট বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং যারা নির্দোষ তাদের সিভিক রাইটস (নাগরিক অধিকার) নিশ্চিত করা। সত্য উন্মোচনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজে একটি টেকসই সংহতি তৈরি করাই এই কমিশনের মূল লক্ষ্য।’
এনসিপির এ নেতা বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা সশস্ত্র বাহিনীর জন্য বর্তমান রেগুলার ফোর্সের দ্বিগুণ আকারে রিজার্ভ ফোর্স তৈরি করা হবে। সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে পাঁচ বছরের মধ্যে সেনাবাহিনীতে একটি ইউএভি (মনুষ্যবিহীন আকাশযান) ব্রিগেড গঠন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুসংহত করতে মাঝারি পাল্লার অন্তত আটটি সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল ব্যাটারি অধিগ্রহণ করা হবে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং তিস্তাসহ সব আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আমরা সর্বোচ্চ কূটনৈতিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করবো। এছাড়া শেখ হাসিনাসহ খুনিদের ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সমাধান না হলে প্রয়োজনে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হবো।’
নাহিদ জানান, ‘হিসাব দাও নামে’ একটি কর্মসূচি থাকবে যেখানে মন্ত্রী-এমপিদের বাৎসরিক আয় ও বাজেটের হিসাব থাকবে। এছাড়া জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা এবং মুদ্রাস্ফীতি ছয় শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)