রাজউক অধ্যাদেশ জারি : নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণে ২ বছর জেল
ঢাকা মহানগরী ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি পরিকল্পিত, আধুনিক ও দুর্যোগ সহনশীল নগর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। একইসঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সাত দশকের পুরনো আইন রহিত করা হয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি) এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। গত ১৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশটি জারি করেন। আইন মন্ত্রণালয়ের পাবলিক রিলেশন্স অফিসার ড. মো. রেজাউল করিম এসব তথ্য জানান।
নতুন আইনে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে; পাশাপাশি কৌশলগত পরিকল্পনা লঙ্ঘন ও জলাশয় ভরাটের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির পরিমাণ ১০ কোটি টাকা অর্থদণ্ড ও ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের পুরনো ‘টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩’ রহিত করে সেটিকে যুগোপযোগী ও আধুনিক করার উদ্দেশ্যে নতুন এই আইনটি কার্যকর করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬ নামে অবহিত হবে।
অধ্যাদেশটি ঢাকা মহানগরী, ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ ও সাভার উপজেলার আওতাধীন এলাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার আওতাধীন এলাকা এবং সরকার কর্তৃক, সময় সময়, জারিকৃত প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত এলাকা প্রযোজ্য হবে।
নতুন অধ্যাদেশের ৫৪ ধারা অনুযায়ী, রাজউকের আওতাধীন এলাকায় কোনো ব্যক্তি অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ করলে তিনি অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। শুধু তাই নয়, ৪৮ ধারা মোতাবেক যদি কেউ কৌশলগত পরিকল্পনা (স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান) বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) চিহ্নিত ভূমির ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন করেন, তবে তার জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা জরিমানা এবং প্রতিদিনের জন্য ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় অধ্যাদেশে জলাশয় ও নিচু জমি ভরাটের ওপর কঠোর নজরদারির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধ্যাদেশের ৪৯ ধারা অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া নদ-নদী, খাল-বিল বা কোনো প্রাকৃতিক জলাধারের পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য দুই বছরের জেল। তবে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে শাস্তির মাত্রা বেড়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশে কেবল সাধারণ নাগরিক নয়, রাজউকের কর্মকর্তাদের অসাধু আচরণের ক্ষেত্রেও শাস্তির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নকশা বহির্ভূত নির্মাণ কাজে সহায়তা করেন বা জেনেও নিরব থাকেন, তবে তাকেও দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানা ভোগ করতে হবে।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীসহ সাভার, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের রাজউক নিয়ন্ত্রিত এলাকায় একটি দুর্যোগ সহনশীল ও আধুনিক নাগরিক জীবন নিশ্চিত করতেই নতুন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসরণ নিশ্চিত করতে এখন থেকে রাজউক নিয়মিত তদারকি এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবে।
অধ্যাদেশে অগৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা উপদেষ্টাকে সভাপতি এবং সংশ্লিষ্ট সচিবকে সহ-সভাপতি করে একটি শক্তিশালী বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডে বিশেষজ্ঞ স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যাতে কর্তৃপক্ষের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
অধ্যাদেশে কৌশলগত পরিকল্পনা এবং বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়নকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার কোনো ব্যত্যয় ঘটানো এখন থেকে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
নতুন এই আইনে ‘ভূমি পুনর্বিন্যাস’ এবং ‘উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময়’ এর মতো আধুনিক ধারণা যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে অপরিকল্পিত বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে বাসিন্দাদের মালিকানা অক্ষুণ্ন রেখে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন পরিকল্পিত এলাকায় রূপান্তর করা সহজ হবে।
অধ্যাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে কোনো ব্যক্তি উচ্ছেদ হলে বা পেশা হারালে তাকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্লট বা ফ্ল্যাট প্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দরিদ্র ও ভূমিহীনদের জন্য আবাসনের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশে রাজউকের যাবতীয় সেবা ডিজিটালাইজড করার পাশাপাশি বোর্ড সভার সিদ্ধান্তসমূহ জনগণের জানাতে ওয়েবসাইটে প্রকাশের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে অধ্যাদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)