সাভারে কে এই ‘সিরিয়াল কিলার ভবঘুরে সম্রাট’
সাভারের আলোচিত সিরিয়াল কিলারকে ঘিরে রহস্য এখনও কাটেনি। কে সে? কী তার পরিচয়? কোথা থেকেই-বা এলো সে– এমন প্রশ্ন এখন মানুষের মুখে মুখে।
প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়েও। দায়সারা ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই আসামির কথা বিশ্বাস করে তড়িঘড়ি তথ্য প্রচার নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তির।
সাভারে পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি সেন্টারে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার- শেষমেশ সিসিটিভির কল্যাণে ভবঘুরে এক ব্যক্তিকে আটকের পর তার নাম মশিউর রহমান সম্রাট বলে জানায় পুলিশ।
ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ভবঘুরে সম্রাটকে আটক দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ- সব প্রক্রিয়ায় তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে মশিউর রহমান খান সম্রাট (৪০)।
পুলিশ যে সিরিয়াল কিলারকে আটক করেছে তার নামের সঠিকতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এ এলাকার সদ্য সাবেক পৌর কাউন্সিলরের নাম মশিউর রহমান সম্রাট। কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ায় বর্তমানে তিনি পলাতক।
অনুসন্ধান বলছে,আটক কথিত ওই সিরিয়াল কিলারের নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট নয়। প্রাপ্ত তথ্য মতে তার নাম সবুজ শেখ। বাবার নাম পান্না শেখ। তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে বড় বোনের নাম শারমিন এবং ভাইবোনদের মধ্যে মেজ সবুজ।
জন্মস্থান সাভারের লালটেক বলা হলেও সেটা সঠিক নয়। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মৌছামান্দ্রা গ্রামে। তার পরিবারের স্বজনদের বেশিরভাগের বসবাস বরিশালে।
সূত্রমতে, পুলিশকে ধোঁকা দিতেই নিজেকে যে মশিউর রহমান খান সম্রাট বলে পরিচয় দিয়েছে। এর কারণ হতে পারে যে এলাকায় তার বিচরণ ছিল বেশি সেই এলাকার সদ্য সাবেক কাউন্সিলের নাম বলে রীতিমতো পুলিশের সাথে নতুন এক খেলার সূচনা করেছে সে।
সর্বশেষ গত রোববার ওই কমিউনিটি সেন্টারে দুটি পোড়া মরদেহ উদ্ধার ও সিসিটিভির ফুটেজের জেরে হত্যাকারী হিসেবে শানাক্তের পর আটক করা হয় কথিত সম্রাটকে।
পরদিন পুলিশের ব্রিফিং এবং পুলিশের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, আসামির নাম মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে সাইকো সম্রাট (৪০), পিতা-মৃত সালাম, মাতা-মৃত রেজিয়া, সাং-ব্যাংক কলোনী, থানা-সাভার, জেলা ঢাকা।
পুলিশের দেওয়া এই ঠিকানা ধরে ওই এলাকা নিবিড়ভাবে খোঁজ খবর নিয়ে কথিত সম্রাটের বাবা ও মায়ের নামের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আসামির নাম যাচাই-বাছাই করা পুলিশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপর নির্ভর করে মামলার মেরিট।
অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, থানার পুলিশ বা এসবি সদস্য আসামির বাড়িতে গিয়ে স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা যাচাই করেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে তার চরিত্র, আচরণ এবং সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ খবর নেন। একজন আসামি তার যা ইচ্ছে তাই নাম বলল আর অমনি পুলিশ তা বিশ্বাস করল- এটা তো পেশাদারত্বের অভাব।
আসামীর সঠিক নাম, ঠিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত করতে আসামীর পরিচয় যাচাই করতে পুলিশ ভিন্ন এলাকার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানায় অনুসন্ধান স্লিপ পাঠায়। এমন একজন কথিত সিরিয়াল কিলারের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা দায়িত্বে অবহেলার শামিল বলেও মন্তব্য করেন অবসরপ্রাপ্ত এ পুলিশ কর্মকর্তা।
আরও পড়ুন : থানার পাশেই থাকতেন ভবঘুরের ছদ্মবেশে, ৭ মাসে করেছেন ৬ খুন!
অবসরপ্রাপ্ত এ পুলিশ কর্মকর্তার মতে, পর্যায়ক্রমে সে যে ছয় জনকে খুন করেছে এবং খুনের কারণ হিসেবে নিজের যে ব্যাখ্যা দিয়েছে সেটিও সন্দেহজনক।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘খুনের কারণ হিসেবে সম্রাট একেকবার একেক রকম দাবি করেছে। একবার দাবি করছেন ভিকটিমরা অনৈতিক কাজ করায় তাদের সে মেরে ফেলেছে। আবার দাবি করছে, শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিভিন্ন স্থান থেকে ভবঘুরে নারীদের সে নির্জন স্থানে নিয়ে আসত। তারা অন্য কারো সঙ্গে কিংবা অন্য কেউ তাদের সঙ্গে অনৈতিক কাজ করলে সে তাদের হত্যা করত।’
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সর্বশেষ ঘটনার আগে তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামে এক ভবঘুরে তরুণীকে সে কমিউনিটি সেন্টারে এনে রাখে। ওই তরুণীর সঙ্গে আরেক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক করলে প্রথমে তাকে কমিউনিটি সেন্টারের দোতালয় নিয়ে হত্যা করে সে। এরপর ওই ভবঘুরে তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলে বলেও জানিয়েছে কথিত এই সিরিয়াল কিলার।
মো আসাদুজ্জামান আরও বলেন, সম্রাটের বক্তব্য কতটা যুক্তিযুক্ত বা আদৌ সত্য কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আশা করি চার্জশিট দাখিলের আগেই সব বিষয় স্পষ্ট করা সম্ভভ হবে।’
যোগাযোগ করা হলে ঢাকা জেলার ডিবির (উত্তর) পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম বলেন, সম্রাট তার বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে পৌর এলাকার ৫ নং ওয়ার্ডের ব্যাংক কলোনি এবং তার বাবার নাম মৃত সালাম এবং মৃত রেজেয়া। বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ছয় খুনের ঘটনায় আটক ব্যক্তির পুলিশের পোশাক পরিহিত একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরমান আলী জানান, বিষয়টি আমার নজরেও এসেছে। হতে পারে পুলিশের কোনো সদস্য তার অব্যহৃত পোশাক মানবিক কারণে তাকে দিয়েছে। আর এটি করে থাকলেও তা সঠিক হয়নি। আমার মতে, তাকে একজন বিকৃতরুচির মানুষ, সাইকোপ্যাথ বলেই মনে হয়েছে।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাতুল ইসলাম জানান, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে একে একে ৬টি হত্যাকাণ্ডে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এর আগে তাকে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হলে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় পরে রিমান্ড মঞ্জুর না করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে আটক হওয়ার পর নিজের নাম পরিচয় গোপন করে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, দেখুন আসামি সব সময় পুলিশকে বিভ্রান্ত করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা বসে নেই। অনুসন্ধান চালিয়ে তার আদ্যপান্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামে অনুসন্ধান এখনো চলমান রয়েছে। জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী খালেক শেখ তাদের আত্মীয়। তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে সবাই চেনে। এছাড়াও এই আসামি এর আগে কাশিমপুর-২ কারাগারে ৬০ নম্বর সেলের পূর্ব বিল্ডিংয়ের নিচতলায় বন্দি ছিল বলেও জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
এ বিষয়ে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আমরা ওই আসামির আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেছি। কিন্তু কোন তথ্যের সাথে ম্যাচ করেনি। তার মানে তার কোন ভোটার কার্ড নেই। ভয় নেই। জালিয়াতি ও ছদ্মবেশ এড়াতে কারাগারে প্রবেশের মুহূর্তে অটোমেডেট ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেনটিফিকেশন সিস্টেমে তার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছে। যে নামই হোক না কেন, কারাগারের রেকর্ডে এবার তার অপরাধের খতিয়ান অন্তর্ভুক্ত, আয়নাবাজির সুযোগ নেই।

জাহিদুর রহমান