সংস্কারের মাধ্যমে জুয়েলারি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব : এনবিআর চেয়ারম্যান
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, দেশের জুয়েলারি খাতে শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার জরুরি। নীতিগত সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন এবং সরকার ও শিল্প-অংশীদারদের নিবিড় সহযোগিতার মাধ্যমে এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
আজ বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নেতাদের সঙ্গে ‘মিট দ্য বিজনেস’ সংলাপে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো ব্যবসায়ীদের স্বচ্ছতা, কমপ্লায়েন্স এবং কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা নিশ্চিত করে নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া।
অনুষ্ঠানে এনবিআর সদস্য (মূসক নীতি) মো. আজিজুর রহমান উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। এতে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সভাপতি এনামুল হক খানসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
জুয়েলারিকে দেশের অন্যতম প্রাচীন শিল্প হিসেবে বর্ণনা করে এনবিআর চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, এ খাত সামাজিক, আবেগীয় এবং আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবে একাধিক উদ্যোগ সত্ত্বেও শৃঙ্খলা ও কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার অভাবে এ খাত প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
আবদুর রহমান খান স্মরণ করিয়ে দেন, দীর্ঘ সময় ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বর্ণ আমদানি অনুমোদন ছিল না। ফলে ব্যাপক অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ দেখা দেয়। তবে পরে আমদানি নীতি প্রবর্তন করা হয়েছে এবং কর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে।
বাজুসের উদ্বেগের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, এ সংলাপের উদ্দেশ্য হলো কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা আইন মানার ক্ষেত্রের বাধা সৃষ্টি করছে, তা সরাসরি শোনা। বিশেষ করে কর, ভ্যাট, শুল্ক এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো জানার জন্য এ সংলাপের আয়োজন করা হয়েছে।
আবদুর রহমান খান বলেন, সব সমস্যাই এনবিআরের আওতায় পড়ে না। ব্যাংকিং-সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আর আমদানি অনুমতির বিষয়গুলো বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত। তবে কর-সংক্রান্ত বিষয়গুলো আমাদের দায়িত্ব এবং আমরা সেগুলো সমাধান করব।
মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বিষয়ে বাজুস নেতাদের সঙ্গে একমত হয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, মোট জুয়েলারি বিক্রয়মূল্যের ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ যৌক্তিক নয়।
আবদুর রহমান খান বলেন, জুয়েলারির মূল্য সংযোজন মূলত শ্রম-নির্ভর। গ্রস ভ্যালুর ওপর ভ্যাট আরোপ কম হারে হলেও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রচলিত মূসক নীতির অধীনে প্রকৃত মূল্য সংযোজনের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে কার্যকর করের চাপ প্রায় ১-২ শতাংশ হয় এবং উচ্চমূল্যের পণ্য যেমন স্বর্ণের ক্ষেত্রে কখনও কখনও আরও কম হয়।
আবদুর রহমান খান আরও বলেন, যদি বাস্তবতা সেটাই হয়, তাহলে গ্রস ভ্যালুর ওপর নির্বিচারে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বাজুস এবং পেশাদার বিশেষজ্ঞদের আসন্ন বাজেটে আইনগত সমন্বয় করতে একটি বাস্তবসম্মত ফর্মুলা প্রস্তাব করার আহ্বান জানান।
১ শতাংশ ন্যূনতম টার্নওভার কর প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান পুনর্ব্যক্ত করেন, টার্নওভার নয়, বরং মুনাফার ওপর কর আরোপের পক্ষে তার অবস্থান। তবে তিনি স্বীকার করেন, করদাতা ও কর কর্তৃপক্ষের মধ্যে দীর্ঘ দিনের অবিশ্বাসের কারণে এ ব্যবস্থা বিদ্যমান।
আবদুর রহমান খান বলেন, এই চক্র ভাঙতে আমরা চাই সঠিক লেনদেন সম্পূর্ণভাবে রেকর্ড করা হোক। প্রয়োজনে আমরা ছোট জুয়েলারি ব্যবসার জন্য একটি সহজ ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করব।
আবদুর রহমান খান আরও বলেন, একবার বাস্তবসম্মত ও সঠিক রেকর্ড নিশ্চিত হলে ন্যূনতম টার্নওভার করের প্রয়োজন ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে।
আর্থিক প্রতিবেদনে অসঙ্গতি তুলে ধরে এনবিআর চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, অনেক ব্যবসায়ী ঋণ পেতে ব্যাংকের কাছে উচ্চ টার্নওভার দেখায়, কিন্তু কর কর্তৃপক্ষের কাছে লোকসান ঘোষণা করে।
আবদুর রহমান খান বলেন, এই দ্বিচারিতা বন্ধ করতে হবে। হিসাব প্রস্তুতকারক, নিরীক্ষক এবং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর হিসাব জমা না হয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, সামান্য বিচ্যুতিও ব্যাপক নন-কমপ্লায়েন্স তৈরি করে।
এনবিআর চেয়ারম্যান আমদানিকারক লাইসেন্সে আরও বিস্তৃত প্রবেশাধিকারের পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং উন্মুক্ততা শৃঙ্খলা উন্নত করবে।
আবদুর রহমান খান বলেন, আমরা যত বেশি সীমিত করি, তত বেশি সমস্যা তৈরি করি। যখন ব্যবস্থা উন্মুক্ত ও নিয়ম মাফিক হয়, তখন শৃঙ্খলা উন্নত হয়।
রপ্তানি-সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান পুনর্ব্যক্ত করেন, ডিউটি ড্র-ব্যাক রপ্তানিকারকদের মৌলিক অধিকার। তিনি বলেন, যদি কোনো রপ্তানিকারক শুল্ক দিয়ে কাঁচামাল আমদানি করে এবং পরে প্রস্তুত পণ্য রপ্তানি করে, তাহলে কোনো নীতির অধীনে ডিউটি ড্র-ব্যাক অস্বীকার করা যায় না।
আবদুর রহমান খান নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব দেন— যেমন আমানত বা গ্যারান্টি দ্বারা সমর্থিত টাইম-বাউন্ড রপ্তানি প্রতিশ্রুতি, যাতে শুল্কমুক্ত আমদানি সম্ভব হয় এবং অপব্যবহার রোধ করা যায়।
এনবিআর চেয়ারম্যান প্রস্তাব দেন, এনবিআর, কাস্টমস, বাজুস, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রযুক্তিগত কমিটি গঠন করা হোক, যাতে জুয়েলারি সংগ্রহ, উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য মানসম্মত কার্যপ্রণালী তৈরি করা যায়।
আবদুর রহমান খান জুয়েলারি খাতের সঙ্গে যুক্ত স্টিগমা দূর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, নেতিবাচক ধারণা ব্যাংকিং ও অর্থায়নে প্রবেশাধিকারকে বাধাগ্রস্ত করে। তিনি বলেন, শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়—এটি নিরাপত্তা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, টেকসই সংস্কার কেবল পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব। আমরা যদি আন্তরিকভাবে একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যাবে, ঝুঁকি হ্রাস করা যাবে এবং এ খাত একটি কমপ্লায়েন্ট, রপ্তানিমুখী ও মর্যাদাবান শিল্পে পরিণত হবে।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)