ডিজিটাল বাংলাদেশে এনালগ গ্রাম
কাগজে-কলমে নাম সুষমানগর হলেও স্থানীয়দের কাছে পরিচিত তৈলংপাড়া। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ইউনিয়নের এই গ্রামটি যেন একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও মধ্যযুগের আঁধারে নিমজ্জিত। উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী পল্লীতে আধুনিক জীবনের কোনো ছোঁয়া আজও লাগেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বনের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ কাদামাটির আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছাতে হয়। বর্ষা মৌসুমে এই একমাত্র পথটিও চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। গ্রামটিতে ২৮টি ত্রিপুরা পরিবারের বসবাস। অধিকাংশ ঘরবাড়ি এখনও বাঁশ, মাটি আর ছনের তৈরি। বিদ্যুৎ নেই, স্কুল নেই, নেই ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা কিংবা নিরাপদ পানির ব্যবস্থা। এমনকি আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম মোবাইল নেটওয়ার্কও এখানে অদৃশ্য। ডিজিটাল বাংলাদেশের জয়যাত্রার মাঝে সুষমানগর বা তৈলংপাড়া গ্রামটি এখনও এনালগ বাস্তবতার এক নির্মম উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকা লেবু, কলা ও নাগা মরিচ চাষ। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন কৃষকরা। জরুরি প্রয়োজনে কোনো রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া এখানে দুঃসাধ্য ব্যাপার। কয়েক কিলোমিটার কর্দমাক্ত পথ হেঁটে বা সাইকেলে গিয়ে তবেই সিএনজি অটোরিকশার দেখা মেলে।
পল্লীর হেডম্যান করোনা দেববর্মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভোট আসলে প্রার্থীরা অনেক আশ্বাস দেন, কিন্তু ভোট শেষ হলে আমাদের কথা কেউ মনে রাখেন না। আমরা কি এই দেশের নাগরিক না? কেন আমাদের উন্নয়ন করা হবে না? সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি- দ্রুত বিদ্যুৎ, রাস্তা আর নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হোক।
বঞ্চনার এই চরম বাস্তবতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেক পরিবার সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ জীবন বাঁচাতে ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। একমাত্র পানির উৎস প্রাকৃতিক ছড়া ও কুয়ার অস্বাস্থ্যকর পানি পান করে গ্রামবাসী প্রায়ই পানিবাহিত রোগে ভুগছেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান জানান, এই অবহেলিত গ্রামটি সম্পর্কে আপনাদের মাধ্যমেই অবগত হলাম। আমি দ্রুত গ্রামটির হেডম্যানসহ স্থানীয়দের সাথে কথা বলব। তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আহাদ মিয়া, মৌলভীবাজার (শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ)