খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকার্ত সারাদেশ
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে আজ শোকের কালো ছায়ায় ঢেকে গেছে পুরো বাংলাদেশ। নীরব কান্নায় থমকে আছে শহর থেকে গ্রাম, মানুষ যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে এই গভীর বেদনার মুহূর্তে। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে গোটা জাতি। সারা দেশে চলছে শোকের মাতম।
আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। খালেদা জিয়া ছিলেন জাতীয় নেত্রী ও দেশের শীর্ষ অভিভাবক। প্রিয় নেত্রীর এমন মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা দেশ। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সরকার তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে এবং এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক-সামাজিক জায়গায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতির এক অত্যন্ত প্রভাবশালী নেত্রী ছিলেন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর মৃত্যুকে অনেকেই এক রাজনৈতিক যুগের অবসান হিসেবে উল্লেখ করছেন।
শোক প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দল ও নেতারা, এমনকি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিদেশি রাষ্ট্রদূতরাও। তারা খালেদা জিয়ার জীবন ও কর্মকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শোক ও সমবেদনা জানানো হচ্ছে এবং বিএনপি নিজ দলীয় কর্মসূচি হিসেবে সাত দিনের শোক পালন করছে।
শোক বইছে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাবার বাড়ির জেলা ফেনীতেও। তার মৃত্যু সংবাদ ফেনীতে পৌঁছানোর পর জেলাজুড়ে এক শোকাতুর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। প্রিয় নেত্রীকে হারানোর খবরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন জেলা বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। ফেনীর সোনালি সন্তান ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিভাবককে হারিয়ে ফেনী বিএনপির শীর্ষ নেতারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
এদিকে খালেদা জিয়ার মৃত্যুসংবাদে তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠার জেলা দিনাজপুরে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। আজ মঙ্গলবার সকালে মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ী এলাকায় অবস্থিত পৈতৃক নিবাস ‘তৈয়বা ভিলা’ শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। সকাল থেকেই বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক, স্বজন ও সাধারণ মানুষ দলে দলে ছুটে আসতে থাকেন তৈয়বা ভিলায়। সবার চোখেমুখে ছিল গভীর বেদনা। কান্না, আহাজারি ও নীরবতার মিশেলে পুরো বাড়ি ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় এক শোক জমায়েতে।
অপরদিকে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী জনপদে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক ভিটা ও খালেদা জিয়ার শশুরবাড়ি হওয়ায় এলাকাজুড়ে শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে। সকাল ৬টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে গাবতলীসহ আশপাশের এলাকায় শোকাহত মানুষের ঢল নামে।
এছাড়াও খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সারা দেশের সকল জনপদে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সারা দেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে গভীর শোক প্রকাশ করছেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া-পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অনন্য নাম। কোটি কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আপসহীন নেত্রী, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। আমি ও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে এই মহীয়সী নারীর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।’
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদ খালেদা জিয়া, আজ সকালে মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।’
লাখ লাখ মানুষ শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তার দীর্ঘ সংগ্রামের পথ এবং আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরছেন অনেকেই।
সাংবাদিক এম মোশাররফ হোসাইন লিখেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে যারা ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে, তাদের উপর আল্লাহর লা'নত বর্ষিত হোক।’
বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মাঝে বিরাজ করছে গভীর শোকের ছায়া। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়, এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকা, গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় এলাকায় অগণিত নেতা-কর্মীকে আহাজারি করতে দেখা গেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করে বার্তা দিয়েছেন।
আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। সকাল সোয়া ৯টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মির্জা ফখরুল কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, এই সংবাদটা নিয়ে সবার সামনে দাঁড়াতে হবে ভাবিনি। আমরা এবারও ভেবেছিলাম তিনি আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলছি আজ ভোর ৬টায়, গণতন্ত্রের মা, আমাদের অভিভাবক, জাতির অভিভাবক আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
মৃত্যুর সময় খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় হাসপাতালে আরও উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমান সিঁথি।
স্বজনদের মধ্যে ছোট ভাই শামীম এসকান্দার ও তার স্ত্রী, বড় বোন সেলিনা ইসলামসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও শেষ সময়ে হাসপাতালে ছিলেন। এছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকেরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি কিডনি, ফুসফুস, হার্ট ও চোখের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাও ছিল তাঁর। হার্ট ও ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড তাঁর চিকিৎসা তদারকি করেন।
এই মাসের শুরুতে চিকিৎসার জন্য তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় পরবর্তীতে তা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক