পেটে গুলি লেগে ভুঁড়ি বের হয়ে যায় ইয়াকুবের
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ দিনে আজও দুইজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ নিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন ১৩ জন।
সাক্ষীতে কাপড় ব্যবসায়ী মো. টিপু সুলতান বলেন, বড় ভাই ইয়াকুব নাজিম উদ্দিন রোডে সোহাগ হোটেলের সামনে গুলিবিদ্ধ হন। আমি সেখানে গিয়ে দেখি ইয়াকুব ভাইয়ের পেট দিয়ে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে গেছে। তার ভুঁড়ি বের হয়ে যায়। জাহিদ নামের একজন তার টিশার্ট খুলে ইয়াকুবের গুলিবিদ্ধ ক্ষতস্থানে বেঁধে দেয়। তারপর জনৈক আন্দোলনকারী ইয়াকুবকে একটি অটোরিকশায় তুলে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। শুনেছি যে, সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এ সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
আজ সাক্ষীর জবানবন্দি দেন কাপড় ব্যবসায়ী মো. টিপু সুলতান। তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকার নিউমার্কেটে কাপড়ের দোকানে চাকরি করি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমার নৈতিক সমর্থন ছিল। আমার বাসা নাজিম উদ্দিন রোডে। গত ৫ আগস্ট বেলা ১১টা বা সাড়ে ১১টার সময় লং মার্চ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য বাসা থেকে বের হয়ে চাঁনখারপুল বোরহানউদ্দিন কলেজের সামনে অবস্থান নিই। ওই সময় আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে আসিফ মোহাম্মদ সজীব ভূঁইয়াও অংশগ্রহণ করে।’
‘আমরা সামনের দিকে যেতে থাকলে বোরহানউদ্দিন কলেজের গেইটের সামনে পৌঁছালে পুলিশ চাঁনখারপুল মোড় থেকে আমাদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও গুলি করে। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। পরবর্তীতে শুনতে পাই আমার এলাকার বড় ভাই ইয়াকুব ভাই নাজিম উদ্দিন রোডে সোহাগ হোটেলের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমি সেখানে গিয়ে দেখি ইয়াকুব ভাইয়ের পেট দিয়ে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে গেছে। তার ভুঁড়ি বের হয়ে যায়। জাহিদ নামের একজন তার টিশার্ট খুলে ইয়াকুবের গুলিবিদ্ধ ক্ষতস্থানে বেধে দেয়। ’
‘তারপর জনৈক আন্দোলনকারী ইয়াকুবকে একটি অটোরিকশায় তুলে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। শুনেছি যে, সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আমরা বোরহানউদ্দিন কলেজের কাছাকাছি অবস্থান করতে থাকি। পুলিশ গুলি করতে করতে বোরহানউদ্দিন কলেজের গেইট পর্যন্ত চলে আসে। পুলিশ আমাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে সেই গুলিটি আমার পাশে থাকা আন্দোলনকারী ইসমামুলের পেটে লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। ইসমামুলকে আমি অটো রিকশায় উঠিয়ে দিলে জনৈক আন্দোলনকারী তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। তাকে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে জানতে পারি যে, সে তিন দিন পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ওই দিন চাঁনখারপুলে ছয়জন আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। আমি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’
সাক্ষীর জবানবন্দিতে মো.মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে মালামাল সরবরাহকারী। আমি চাঁনখারপুলে বসবাস করি। জুলাই ২০২৪ আন্দোলনে আমি ও আমার ছেলে তৌফাউজ্জামান ৪/৫ দিন অংশগ্রহণ করি। গত ৫ আগস্ট সকালে আমার ছেলে আমাকে না বলে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে যায়। তখন খুব গোলাগুলি হচ্ছিল। আমি ছেলেকে খুঁজতে বের হয়ে নিমতলি যাই। ফোন করি। ছেলে বলে, আমি নিমতলির কাছাকাছি আছি। গোলাগুলির জন্য রাস্তা ক্রস করতে পারছি না।’
মনিরুজ্জামান বলেন, ‘তখন আনুমানিক ১১টা বা সাড়ে ১১টা বাজে। ১২টা বা সাড়ে ১২টার দিকে আমি ও আমার ছেলে খলিফা পট্টি এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেই। আমরা চাঁনখারপুলের দিকে এগুচ্ছিলাম। তখন পুলিশ গুলি করতে করতে আমাদের দিকে আসে। পুলিশের গুলিতে আমার সামনে থাকা জুনায়েদ নামে একজন আন্দোলনকারী মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়। ৩/৪ জন আন্দোলনকারী জুনায়েদকে রিকশায় তুলে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেদিন বিকেলের দিকে জানতে পারি যে, গুলিবিদ্ধ জুনায়েদ মারা গেছে। সেদিন ২টা বা আড়াইটার দিকে জানতে পারি শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে। সেদিন চাঁনখারপুল এলাকায় ৫/৬ জন আন্দোলনকারী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। আমি এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত সকলের বিচার চাই।’

নিজস্ব প্রতিবেদক