‘বিচার চাই না, মামলা সামলালেই খুশি’
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অবরোধ-হরতালের সময় পুলিশের গুলিতে আহত জগন্নাথ বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষার্থী নয়ন বাছার (২১) জামিন পেয়েছেন। তবু দিন কাটছে তাঁর ‘বন্দিদশায়’। এখনো জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল এবং পুনর্বাসন কেন্দ্রের (ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল) প্রিজন সেলের বিছানাতেই তাঁকে সারাদিন শুয়ে-বসে থাকতে হচ্ছে।
নয়ন জানান, পুলিশ বাম পায়ের উরুতে দুটি গুলি করেছিল। এরপর থেকেই ওই পা চলৎশক্তিহীন।
নয়নের মা শিখা রাণী মজুমদার ছেলের শিয়রের পাশে বসে দিনরাত ওই পায়ের দিকেই তাকিয়ে থাকেন। জানালেন, সব সময় তাঁর বুক শঙ্কায় কেঁপে ওঠে, নয়ন কি আর কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে না?
নয়নের গুলিবিদ্ধ পা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে যে অর্থের প্রয়োজন, সেই সক্ষমতা তো নেই দরিদ্র স্কুল-শিক্ষিকা শিখা রাণীর। তিনি হতাশায় কখনো হাসপাতালের করিডরে গিয়ে একা একা কাঁদেন, কখনো-বা মায়ের চোখের জলে ভিজে ছেলের বিছানা-বালিশ। তিন মাস পর জামিনের আনন্দও ম্লান হয়ে গেছে ছেলের ভবিষ্যতের চিন্তায়।
‘জানেন গত তিন মাসে ঢাকা শহরের এমন কোনো জায়গা নাই যেখানে ছেলের জামিনের জন্য চোখের জল ফেলাই নাই। ভগবান মুখ তুলে চাইছেন, ছেলের জামিন হইছে। কিন্তু, এখন নয়নের পায়ের চিন্তায় আমার ঘুম আসে না।’ কাঁদতে কাঁদতে এনটিভি অনলাইনকে বললেন শিখা রাণী ।
গত বুধবার দুপুরে হাসপাতালে কথা হয় নয়ন ও তাঁর মায়ের সাথে। শিখা রাণী বলেন, ‘এর মধ্যে তিন লাখ টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে। ডাক্তার বলছে, নয়নের পা স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে আরো প্রায় চার-পাচ লাখ টাকার প্রয়োজন। এত টাকা আমি কোথায় পাব? সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি আমার নয়নের সহায়তায় এগিয়ে আসত, তাহলে আমার ছেলে বোধহয় আবার স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারত।’
শাড়ির আঁচলে মুখ মুছে শিখা রাণী আবার বলেন, ‘জানেন, ছোটবেলা থেকেই নয়নের শখ পুলিশ অফিসার হবে। এখন পুলিশের হাতেই আমার ছেলের জীবনটা তছনছ হয়ে গেছে। জামিন তো পেলাম, কিন্তু মামলাটার কী হবে?’
নয়নদের গ্রামের বড়ি বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে। মাত্র ছয় মাস বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও জীবন বাজি রেখে ছেলেকে মানুষ করে তুলেছেন ১৪৫ নম্বর এইচ কে হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শিখা রাণী মজুমদার। গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুরান ঢাকায় কোনো একটি এলাকায় বাসে আগুন দেওয়ার অভিযোগে নয়ন বাছারের পায়ে গুলি চালায় কোতোয়ালি থানা পুলিশ। পরে সূত্রাপুর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা দেওয়া হয়। তখন থেকেই তিনি পঙ্গু হাসপাতালে পুলিশ প্রহরায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাসপাতালে বসেই তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের এই শিক্ষার্থী। গত ১৭ মে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক কামরুল ইসলাম মোল্লা জামিনে নয়নের মুক্তির আদেশ দেন। গত সোমবার রাতে জামিনের আদেশের কাগজ থানায় পৌঁছে। তারপর থেকেই নয়নের পুলিশ প্রহরা তুলে নেওয়া হয়। তবু এখনো সাধারণ ওয়ার্ডে সিট বরাদ্দ না পাওয়ায় প্রিজন সেলেই থাকতে হচ্ছে নয়নকে।
গত বুধবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মা আর ছেলে পাশাপাশি বসে খাচ্ছেন। নয়নের বাঁ পা সামনে মেলানো, বালিশের ওপর। সেই পায়ে একটা স্যান্ডেল, তার ওপর একটা প্লাস্টিকের নল বাঁধা। তার পাশে কতগুলো ফটোস্ট্যাট করা নোট পেপার। সেদিন নয়নের কোনো পরীক্ষা ছিল না। পরের দিন (বৃহস্পতিবার) আবার পরীক্ষা। খাবার শেষ করে নয়ন আর তাঁর মা শিখার রাণী কথা বলেন।
সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নয়ন বলেন, “৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর আমি পশ্চিম যাত্রাবাড়ীর দয়াগঞ্জের একটি মেস থেকে বেরিয়ে গুলিস্তানে আসি এক জোড়া স্যান্ডেল কেনার জন্য। কালো রঙের স্যান্ডেল কিনে সেখান থেকে বাসে উঠে রওনা হই লক্ষ্মীবাজারের একটি বাসায় টিউশনির জন্য। বাসটির মাঝখানের একটি সিটে বসেছিলাম। শাঁখারিবাজারে আসার পরই দুর্বৃত্তরা বাসটিতে আগুন দেয়। এ সময় সামনে ও পিছন থেকে লোকজন ছুটে বাস থেকে নামতে থাকে। আমিও দৌড়ে বাস থেকে নেমে পড়ি। বাস থেকে নামার পর পরই সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা পুলিশ আমাকে আটক করে। তাদের মধ্যে একজন বলে, ‘এই তুই শিবির করিস।’ আমি বলি, ‘ভাই আমি হিন্দু মানুষ, নাম নয়ন বাছার। আমি শিবির করব কেন? আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি।’ তখন পুলিশের একজন বলেন, ‘নয়ন বাশার আবার হিন্দুর নাম হয় নাকি?’ এ সময় তাঁরা আমার হাতে থাকা মোবাইল নিয়ে কললিস্ট চেক করে। প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে আমার মানিব্যাগ নিয়ে নেয়।

এর মধ্যেই সেখানে পুলিশের একটি গাড়ি আসে। আমাকে চোখ বেঁধে সেই গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। গাড়িটি কিছুদূর যায়। তারপর আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আমার হাত ও জামা-প্যান্টের গন্ধ শুঁকে একজন পুলিশ বলেন, ‘না স্যার, কোনো পেট্রল-ডিজেলের গন্ধ নাই।’ তারপর একটু থেমে আমাকে মাটিতে শুইয়ে দেওয়া হয়। আমি টের পাচ্ছিলাম আমার হাত-পা বুট দিয়ে চেপে ধরে রেখেছিল পুলিশ। আমি নড়তে পারছিলাম না। এর মধ্যেই একজন বলে, ‘গুলি কর।’ আরেকজন বলে, ‘স্যার, চাইনিজ না শটগান?’ ‘শটগান, শটগান’- বলার পরই আমার বাম পায়ের উরুতে গুলি করে দেয়। এরপর আমি আর কিছু মনে করতে পারি নাই, অজ্ঞান হয়ে যাই।”
নয়ন বলেন, ‘গাড়িতে তোলার পরই আমার আবার জ্ঞান ফিরে আসে। আমাকে তো পাটাতনে ফেলে রেখেছিল। আমি ঘাড়-মাথা নাড়াতে পারছিলাম না। কিন্তু টের পাচ্ছিলাম আমি রক্তে ভেসে যাচ্ছি। এভাবে কখনো জ্ঞান ফেরে, আবার কখনো অজ্ঞান হয়ে যাই। একসময় আমি চোখ খুলে দেখতে পাই, আমাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, আমার চারপাশে পুলিশ। সেখান থেকেই আমি এক চিকিৎসকের মোবাইল দিয়ে মাকে ফোন দেই। কিন্তু আমার আসলে কী হয়েছে সেটি জানাই না। পরে ওই চিকিৎসক মাকে ফোন করে জানান যে, আমাকে পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এর মধ্যে আমার পরিচিতরা পঙ্গু হাসপাতালে চলে আসে। সেই রাতে পুলিশ আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও নিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার পা কেটে ফেলারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার পরিচিতদের বাধার কারণে আর পা কেটে ফেলেনি।’
এই ঘটনার বিচার চান না? প্রশ্নে নয়ন চুপ থাকেন। পাশ থেকে তাঁর মা শিখা রাণী বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, বিচার তো আসল জায়গায় দিয়া রাখছি। ওপরওয়ালা এর বিচার করবেন। এখন যদি নয়নের পা-টা আবার স্বাভাবিক হয় আর মামলাটা শেষ হয়, তাহলেই আমি খুশি। আর কিছু চাই না।’
