কারাগারে আসামির সই নেওয়ার চেষ্টা এমপিপুত্রের
সোনা চোরাচালান মামলায় কারাগারে আটক সাতক্ষীরার ব্যবসায়ী মিলন পালের স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে কয়েকদিন আগেও অনুরোধ করেছিলেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) রিফাত আমিন। এ জন্য ছেলে রাশেদ সারোয়ার রুমন জেলগেটেও গিয়েছিলেন। মিলন পালের কাছ থেকে কাগজে সই নেওয়ার জন্য জবরদস্তিও করেন সে সময় তিনি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ দেখে ফেলায় তা সফল হয়নি।
গতকাল মঙ্গলবার ঈদের দিনও একই চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এবার রুমন যাননি। ২৫০ টাকা মূল্যের স্ট্যাম্প দিয়ে পাঠিয়েছিলেন নিজের এক ঘনিষ্ঠ সহকারী যুবককে। কিন্তু এবারও বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। কারারক্ষীরা স্ট্যাম্পটি জব্দ করে অজ্ঞাত ওই যুবককে জেলগেট থেকে দ্রুত সরিয়ে দেন।
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা কারাগারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজ বুধবার এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘কয়েকদিন আগে সংসদ সদস্য মিসেস রিফাত আমিন টেলিফোনে আমাকে অনুরোধ করেছিলেন স্ট্যাম্পে মিলন পালের সই করিয়ে দিতে। এ জন্য স্ট্যাম্পসহ তিনি ছেলে রুমনকেও কারাগারে পাঠিয়েছিলেন।’
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘এটা আইনসিদ্ধ নয়। জেলা হাকিম অথবা সংশ্লিষ্ট কোনো আদালতের নির্দেশনা ছাড়া কারাগারে অবস্থান করা আসামির সই করানো বেআইনি, কারাবিধির লঙ্ঘন। ফলে তখন আমি রুমনকে ফেরত পাঠিয়েছিলাম।’
এদিকে ঈদে জেল সুপারসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছুটিতে রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এখন কারাগারে জনবল কম। এই সুযোগে গতকাল মঙ্গলবার মিলন পালের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিতে ফের এক যুবককে পাঠানো হয় বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারাগারের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এনটিভি অনলাইনকে জানিয়েছেন। তবে ওই যুবক সফল হননি।
সাতক্ষীরার ‘মিলন জুয়েলার্সের’ মালিক মিলন পাল ১৬ কেজি সোনা চোরাচালান মামলায় গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে এই কারাগারে আটক রয়েছেন।
এ ব্যাপারে আজ মিলনের স্ত্রী শম্পা রানী পাল এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আমার স্বামী কারাগারে থাকার সুযোগে এমপি ও তাঁর ছেলে আমাদের সম্পদ লুটপাট শুরু করেছেন। এখন নতুন ফন্দিতে জেলে থাকা আমার স্বামীর সই-স্বাক্ষর নিয়ে আমাদের সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। এ কারণেই জেল থেকে সই আনার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।’
অবশ্য এর আগে সংসদ সদস্য রিফাত আমিন এনটিভি অনলাইনকে বলেছিলেন, ‘মিলন তাঁর গাড়িটি আমার ছেলে রুমনের নামে লিখে দিয়ে গেছেন। তা ছাড়া ওর বাগানবাড়িতে থাকবার লিখিত অনুমতিও দিয়েছেন তিনি।’
সংসদ সদস্যের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে মিলনের স্ত্রী শম্পা রানী পাল বলেন, ‘আমার স্বামী রুমনের নামে গাড়ি-বাড়ি কোনো কিছুই লিখে দেননি।’
সাতক্ষীরার ওই সংসদ সদস্যের ছেলে রুমন একের পর এক ঘটনার কারণে খবরের শিরোনাম হয়েছেন। তাঁকে নিয়ে স্থানীয়ভাবে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
গত রোববার সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা পৌরসভা চত্বরে কাটিয়া এলাকায় জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য জুলফিকার রহমান উজ্জ্বলকে রড দিয়ে পেটান রুমন। তাঁকে বাঁচাতে গেলে আরো তিন যুবককে পেটান রুমন ও তাঁর সঙ্গীরা। ঘটনার পর উজ্জ্বলকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এরপর রাত ১০টার দিকে সাতক্ষীরার ভোমরায় দুর্ঘটনার কবলে পড়েন রুমন। এতে তিনি অক্ষত থাকলেও দুমড়েমুচড়ে যায় তাঁর মায়ের ব্যবহৃত মিনি পাজেরো (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৫-১৬৩০)। ঘটনার পরপর রুমন দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে অজ্ঞাত স্থানে চলে যান।
পরদিন সোমবার দুপুরে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের মাগুরা গ্রামের বাঁশতলা এলাকায় কারাগারে থাকা আসামি মিলন পালের বাগানবাড়ি হিসেবে পরিচিত দোতলা বাড়ি থেকে রাশেদ সরোয়ার রুমন ও এক তরুণীকে আটক করে স্থানীয় জনতা। তারা তাঁকে পিটুনি দেয়। পরে সেখান থেকে দুজনকে উদ্ধার করেন জেলা যুবলীগের সভাপতি আবদুল মান্নানসহ অন্যরা।
এর আগে গত রমজান মাসে সাহেব আলী নামের এক গরু ব্যবসায়ীকে রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করার অভিযোগ রয়েছে রুমনের বিরুদ্ধে। তার আগে জাতীয় সংসদের স্টিকারযুক্ত গাড়িসহ কয়েকজন তরুণীকে নিয়ে শ্যামনগরের একটি রিসোর্টে ধরা পড়ে জেল খাটেন রুমন।
এদিকে গত সোমবার গণপিটুনির সময় রুমন ভুলে তাঁর মায়ের নামে লাইসেন্স করা পিস্তল, মিলনের ১১টি গরু বিক্রির টাকা ও অন্যান্য জিনিস বাগানবাড়ি থেকে নিতে ভুলে যান। ওই দিন রাতে এক দফা চেষ্টা করেও রুমন ও তাঁর মা বাগানবাড়িতে ঢুকতে পারেননি।
পরদিন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় সংসদ সদস্য রিফাত আমিন ও তাঁর ছেলে রুমনসহ একটি দল মিলন পালের বাগানবাড়িতে গিয়ে তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। তাঁরা ওই পিস্তল ও পছন্দমতো জিনিসপত্র নিয়ে বের হন।
এর আগে মিলনের বাবা দেবদাস পাল অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর ছেলে জেলে আটক থাকার সুযোগে কয়েকদিন ধরে তাঁর বাগানবাড়ির সম্পদ লুটপাট চলছে। তিনি বলেন, এই বাড়ির খামারে থাকা ১৩টি বড় জাতের গরু রুমন নিয়ে গেছে। এর মধ্যে সে ১১টি বিক্রি করে দিয়েছে। অপর দুটি বাড়িতে রেখে দিয়েছে।
দেবদাস পাল বলেন, ‘আমার ছেলেকে জেল থেকে মুক্ত করাতে রুমন তাঁর সংসদ সদস্য মায়ের কথা বলে ২০ লাখ টাকা নিয়েছে। আরো ১০ লাখ টাকা ও এলিয়েন প্রাইভেট কারটি চেয়েছে।’
এ সব বিষয়ে সংসদ সদস্য রিফাত আমিন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার।’
অপরদিকে রুমনও বলেছেন, তিনি মিলনকে ছাড়াতে কোনো টাকা নেননি।

সুভাষ চৌধুরী, সাতক্ষীরা