নারায়ে তাকবির বলে পালিয়ে যায় ৩ জন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল ইসলাম সিদ্দিকীর হত্যাকাণ্ডে তিনজন জড়িত ছিল। এদের মধ্যে দুজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। অন্যজন মোটরসাইকেল নিয়ে ঘটনাস্থলের ২০ গজ দূরে রাজশাহী-নাটোর সড়কের শালবাগান বটতলা মোড়ে ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিয়ে হত্যাকারীরা ওই মোটরসাইকেলে করে চলে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শী একজনের বরাত দিয়ে আজ বুধবার দুপুরে রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার মো. শামসুদ্দিন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
এদিকে তিনটি কারণ ধরে অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তিন কারণ হলো- সংস্কৃতিমনা অধ্যাপক রেজাউলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় কখনো ধর্ম নিয়ে তিনি কোনো বক্তব্য দিয়েছিলেন কি না এবং কারো সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল কি না। এর মধ্যে প্রথম দুটি কারণকে আপাতত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত এ তিন কারণের উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণাদি সংগ্রহ করতে পারেনি পুলিশ। যা তদন্ত হচ্ছে সবই অনুমাননির্ভর।
বুধবার বিকেলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কমিশনার বলেন, নগরীর শালবাগান বটতলা মোড়ে মোটরসাইকেল নিয়ে একজন ছিলেন। সেখান থেকে ২০ গজ দূরে গলির মধ্যে অপর দুজন কুপিয়ে হত্যা করেন অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে। হত্যার পর খুনিরা দ্রুত মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যায়। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেখেছেন এমন একজনকে পাওয়া গেছে। তাঁর কাছ থেকে ঘাতকদের চেহারার একটা বর্ণনা পাওয়া গেছে। সেই সূত্র ধরে হত্যাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। কে এবং কী কারণে অধ্যাপক রেজাউলকে হত্যা করা হয়েছে, তা উদ্ধারে একাধিক টিম কাজ করছে।
আরএমপি কমিশনার মো. শামসুদ্দিন বলেন, হত্যাকারীরা নারায়ে তাকবির স্লোগান দিয়ে পালিয়ে গেছে। এ থেকে তাদের পরিচয় কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। তিনি বলেন, এর আগে বাগমারা থেকে আটক দুজনের মধ্যে গোপালপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক মুনসুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আর মসজিদের ইমাম রায়হান আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
পুলিশ কমিশনার জানান, অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী তাঁর নিজ গ্রামে একটি গানের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু তাঁর গ্রামের মসজিদের ইমাম রায়হান আলী সংগীত পছন্দ করেন না। তিনি গানের স্কুল প্রতিষ্ঠার সময় সামান্য বিরোধিতাও করেছিলেন। কিন্তু তারপরও রেজাউল করিম এলাকার শিশুদের সংগীত শিক্ষার জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়েই ইমাম রায়হান আলী অধ্যাপক রেজাউলকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখতেই মঙ্গলবার ভোরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।
রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, বাগমারায় এক সময় জেএমবি ক্যাডারদের অবাধ বিচরণভূমি ছিল। ২০০৪ সালে বাগমারায় জেএমবির উত্থান হলে এলাকার অনেকেই তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এরপর বাংলাভাইসহ জেএমবির পতন হলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে বাগমারার স্থানীয় জেএমবি ক্যাডাররা। তাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে এখনো জেলহাজতে রয়েছে। আবার অনেকেই জামিন পেয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর বাইরেও কিছু জেএমবি ক্যাডার এখনো এলাকায় ঘাপটি মেরে থাকতে পারে। আর সেই এলাকাতেই শিক্ষক রেজাউল করিম সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। আবার গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন উৎসব-পার্বণও অধ্যাপক রেজাউল আয়োজন করতেন। এসব কারণে ওই এলাকায় ঘাপটি মেরে থাকা জেএমবি ক্যাডাররা ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল কি না, সেটিও খুঁজে দেখছে পুলিশ।
মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. শামসুদ্দিন জানান, শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের সময় প্রাসঙ্গিক ধর্মীয় কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই কথার কারণে ক্লাসের শিক্ষার্থীরা বাইরে গিয়ে আলোচনা করার ফলে উগ্রবাদীদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়ে তাঁকে খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়টিও পুলিশ মাথায় রেখে তদন্ত করে যাচ্ছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, হত্যাকাণ্ডের ধরনের সঙ্গে উগ্রপন্থীদের জড়িত থাকার বিষয়টিই বেশি মনে হচ্ছে। আর তারা কেন অধ্যাপক রেজাউলকে হত্যা করতে পারে, সে বিষয়টিই আগে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
অপরদিকে পুলিশের আরেকটি সূত্র জানায়, অধ্যাপক রেজাউল করিমের সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ের জের ধরে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেটিও পুলিশ খতিয়ে দেখছে। এজন্য তাঁর মোবাইল ফোনের কললিস্ট ধরেও তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঘটনার দিন থেকে শুরু করে তার আগের কয়েকদিনের কললিস্টও পুলিশ যাচাই-বাছাই করছে। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণ হাতে পায়নি পুলিশ।
রাজশাহী মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ঘটনার গভীরে প্রবেশের মতো কোনো তথ্য আমরা খুঁজে পাইনি। তবে তিনটি বিষয়কে মাথায় রেখেই তদন্তকাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে দুটি বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অপরটি নিয়েও কিছু কাজ এগিয়ে গেছে।’
গত শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নগরীর শালবাগান এলাকার বাসায় নাস্তা করে ক্যাম্পাসে যাওয়ার উদ্দেশে বের হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী। বাসা থেকে মাত্র দেড়শ গজ দূরে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ওই দিনই তাঁর ছেলে রিয়াসাত ইমতিয়াজ সৌরভ বাদী হয়ে বোয়ালিয়া মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।

শ. ম সাজু, রাজশাহী