ছাত্রলীগের দুই নেতার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ!
মানিকগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাদেকুল ইসলাম সোহা ও সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক রুবেলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, শিক্ষকদের মারধরসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের নানা কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ২৫ জন নেতা। তাঁরা আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে ছাত্রলীগের ওই দুই নেতাকে অব্যাহতি দিয়ে জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠনের অনুরোধ করেছেন।
লিখিত অভিযোগে সই করা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম মহিউদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম। অভিযোগের একটি কপি মানিকগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের কাছে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাদেকুল ইসলাম সোহা ও এনামুল হক রুবেল তাঁদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। এ সময় তাঁদের বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়টিও অস্বীকার করেন। তাঁরা বলেন, এমন অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক।
আজ শনিবার দুপুরে ছাত্রলীগের দুই নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগের কপিসহ আনুষঙ্গিক কাগজপত্র মানিকগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের কাছে পেশ করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক সুলতানুল আজম আপেল।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের আগের দিন রাতে মানিকগঞ্জ শহীদ রফিক সড়কের অন্তত ৪০টি দোকান থেকে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সোহা ও সাধারণ সম্পাদক রুবেল জোর করে কয়েক লাখ টাকার পাঞ্জাবি, প্যান্ট, শার্ট, গেঞ্জি নিয়ে যান। এ ব্যাপারে দোকান মালিকরা প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনের কাছে অভিযোগ করেন। প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগের সঙ্গে দোকান মালিকদের ওই অভিযোগও সংযুক্ত করা হয়েছে।
বিভিন্ন হোটেল, ক্লিনিক, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আনা হয়েছে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে ডক্টরস ক্লিনিকের মালিক ডা. খায়রুল হাসানের দায়ের করা মামলার কপি সংযুক্ত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া অভিযোগের সঙ্গে।
এ ছাড়া দেবেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ ও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে প্রহার করা, প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী বারী সিদ্দিকীর সংগীতানুষ্ঠানের মঞ্চ ভেঙে শিল্পীকে আহত করা, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় গভীর রাতে সার্কাস প্যান্ডেলে জোর করে পাঁচ ছয়জন প্রবেশ করে শিল্পীদের নগ্ন নৃত্য দেখাতে বাধ্য করা, মানিকগঞ্জ পৌরসভার বাজেট অনুষ্ঠানে ভাঙচুর করা, জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার নামে ছাত্রদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে আরো বলা হয়, মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রকাশ্যে টেন্ডারের শিডিউল নিয়ে তুলকালাম করা, তুর্কি রাষ্ট্রদূতের সম্মানে মানিকগঞ্জ সার্কিট হাউসে রাজনৈতিক নেতাদের আয়োজনে মধ্যাহ্ন ভোজের সব খাবার লুট করা হয়।
লিখিত অভিযোগের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মচারীদের কর্তব্যকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রুবেলের বিরুদ্ধে করা মামলার কপিও সংযুক্ত করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘(ছাত্রলীগ) সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের এহেন কার্যকলাপে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের মানসকন্যা দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারসহ এলাকায় দলীয় রাজনীতির ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। মানিকগঞ্জের তিনটি আসনে জনসমর্থন কমানোর অপচেষ্টায় তারা লিপ্ত আছে।
‘এলাকার ব্যবসায়ী, সুধীসমাজ, সাধারণ মানুষ এদের কার্যকলাপ থেকে মুক্তি চায়, প্রতিকারের আশায় থানায় একাধিক অভিযোগ করে। যার অনুলিপি আপনার সদয় অবগতির জন্য সংযুক্ত করে প্রেরণ করা হলো।
‘এমতাবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী রাজনীতির ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে বর্তমান জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে অব্যাহতি দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’
জেলা ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় দুই নেতার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম বলেন, ‘জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরই আমরা ওই পদক্ষেপটি নিয়েছি।’
ছাত্রলীগের নেতাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগে সই করা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক সুলতানুল আজম আপেল, জাতীয় শ্রমিক লীগের মানিকগঞ্জ জেলার সভাপতি বাবুল সরকার, জেলা যুবলীগের সভাপতি সুদেব কুমার সাহা, মানিকগঞ্জ পৌরসভার প্যানেল মেয়র মো. আরশেদ আলী বিশ্বাস, মানিকগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবু বকর সিদ্দিক খান, মানিকগঞ্জ পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোনায়েম খান, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক প্রভাষক বাসুদেব সাহা, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক খান খালিদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি তুষার কান্তি সরকার তুপ, মানিকগঞ্জ সদর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও গড়পাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আফছার উদ্দিন সরকার, জেলা জজকোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. মেহের উদ্দিন প্রমুখ।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ