আগাম জামিনে হাইকোর্টকে মানতে হবে সাত শর্ত
হাইকোর্টের আগাম জামিনের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে এখন থেকে আগাম জামিন দেওয়ার জন্য আপিল বিভাগের দেওয়া সাত দফা নির্দেশনা মেনে চলতে হবে হাইকোর্টকে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সম্পাদকের করা আবেদনের শুনানি শেষে আজ বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করে আগাম জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিলেন। সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে আদালত তা খারিজ করে দেন। কারণ খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মামলায় আদালত ওই রায় দেন। কিন্তু আইন অনুযায়ী যিনি ভুক্তভোগী তিনি শুধু রিভিউ করতে পারেন। এখানে রিভিউ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাঁরা দুজনই রাজনৈতিক নেতা। তাই আদালত শুনানি করে তাঁদের আবেদন খারিজ করে দেন।’
অন্যদিকে আবেদনকারী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আদালত আমাদের আবেদন খারিজ করেছেন। সারা দেশের আইনজীবীদের দাবি ছিল এ বিধি-নিষেধের ফলে আগাম জামিন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, আইনজীবীদের জীবন-জীবিকায় সমস্যায় হচ্ছে। কিন্তু আদালতের এ আদেশে আমরা হতাশ, এ বিষয়ে আমরা পরে বড় আকারে সংবাদ সম্মেলন করে কথা বলব।’
আদালতে রিভিউ আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা অর্থ পাচারের মামলায় আগাম জামিন বাতিল করে আপিল বিভাগ রায় দেন। রায়ে আগাম জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে সাত দফা নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
আপিল বিভাগ রায়ে বলেন, ‘হাইকোর্ট (সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ) আপিল বিভাগের দেওয়া নীতিমালা অনুসরণে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা কেবল এটাই বলছি, হাইকোর্ট বিভাগের ওই বেঞ্চ পরিহাসমূলক (প্যারাডক্সিকাল) আগাম জামিনের আদেশ দিয়েছেন। আপিল বিভাগ এতে হতাশা ব্যক্ত করে আগাম জামিনের বিষয়ে সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।’
একই বছরের ১৮ জুন এই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। সমিতির পক্ষে সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন এবং সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন পুনর্বিবেচনার আবেদনের বাদী হন।
হাইকোর্টের আগাম জামিন মঞ্জুরের ওপর শর্তারোপ করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনার জন্য ২০১৫ সালের ১৪ মে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন তা শুনানির জন্য ২৮ মে দিন নির্ধারণ করে আবেদনটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি-২০১৪ আপিল বিভাগের দেওয়া নির্দেশনাগুলো হলো
হাইকোর্ট এখন থেকে চার সপ্তাহের বেশি আগাম জামিন দিতে পারবেন না। হাইকোর্টকে অবশ্যই আগাম জামিনের কারণ উল্লেখ করতে হবে এবং সন্তুষ্টির দিকগুলোও লিপিবদ্ধ করতে হবে। আগাম জামিন প্রার্থিত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় অথবা তার সাথে কারো বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলার উদ্ভব হয়েছে এ ধরনের দাবি জামিন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে বিবেচ্য হতে পারে না। একই সাথে আপিল বিভাগ মনে করে, নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা এখন আর সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন নন। নিম্ন আদালত স্বাধীন নন বা নিম্ন আদালতের বিচারকদের নির্বাহী বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে- এ রকম ধারণাকে সুনির্দিষ্ট ধরে নেওয়া যাবে না। দেশে আগাম জামিনের কোনো আইন নেই। হাইকোর্ট তাঁর অন্তর্নিহিত ক্ষমতায় আগাম জামিন প্রদান করে থাকেন। অতীতে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নেতা-কর্মীদের জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে হাইকোর্ট উদার মনোভাব দেখিয়েছেন।
এর আগে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর আগাম জামিন বন্ধ হয়ে যায়। ২০১০ সালে রাষ্ট্র বনাম জাকারিয়া পিন্টু মামলায় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ আগাম জামিন নিরুৎসাহিত করে একটি রায় দেন।
ওই রায়ে বলা হয়েছিল, জামিনের এখতিয়ার বিচারিক আদালতের। হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের এখতিয়ারের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আগাম জামিন প্রদান করে নিম্ন আদালতকে পুনরায় জামিন দেওয়ার জন্য হাইকোর্ট কোনো নির্দেশনা দিতে পারে না। ওই রায়ের পর আগাম জামিন বন্ধ হয়ে যায়। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে হাইকোর্ট নির্দিষ্ট সময় দিয়ে আসামিকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে আসছেন।

জাকের হোসেন