বাড়িভাড়া নির্ধারণে কমিশন গঠনের নির্দেশ
বাড়িভাড়া নির্ধারণে আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠনসহ তিনটি নির্দেশনা দিয়ে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ কমিশন এলাকাভেদে গণশুনানি করে ন্যায্য ভাড়া নির্ধারণ করার পাশাপাশি মালিক ও ভাড়টিয়াদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি করবেন।
জনস্বার্থে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের নিষ্পত্তি করে আজ বুধবার বিচারপতি বজলুর রহমান ও বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুসের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
রায়ে বলা হয়েছে, কমিশন হবে সাত সদস্যের। এতে থাকবেন আইন মন্ত্রণালয়ের একজন সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, একজন অর্থনীতিবিদ, একজন এনজিওকর্মী এবং একজন সম্মানিত নাগরিক। আর এ কমিশন গঠন করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
অপর দুটি নির্দেশনা হলো- এক. সরকার আর্থিক সক্ষমতা সাপেক্ষে প্রত্যেক ওয়ার্ডে একজন করে রেন্ট কনট্রোলার (ভাড়া নিয়ন্ত্রক) নিয়োগ দেবেন। যিনি বাড়ির মালিক এবং ভাড়াটিয়ার মধ্যে বিরোধ হলে তা নিষ্পত্তি করবেন।
দুই. ভাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়াদের জোরপূর্বক বের করে দিলে বা গ্যাস-বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিলে তিনি সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অভিযোগ করবেন। অভিযোগ আমলে নিয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
রায়ে বলা হয়, কমিশন গঠনের পর এ কমিশন রাজধানীসহ দেশের শহরে এলাকাভেদে মতামত, যুক্তি ও গণশুনানি করে ভাড়া নির্ধারণ করবেন। এ ছাড়া মালিক ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যে কী কী কারণে বিরোধ হয়, সে বিষয়টি খুঁজে বের করবেন। এ কমিশন সরকারের কাছে সুপারিশ উত্থাপন করবেন। এরপর সরকার বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন যুগোপযোগী না হওয়া পর্যন্ত সরকারের আর্থিক সক্ষমতাসাপেক্ষে ওয়ার্ডভিত্তিক একজন রেন্ট কন্ট্রোলার নিয়োগ করবেন। এ ছাড়া ভাড়াটিয়াদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা মালিকদের সঙ্গে ভাড়াটিয়াদের কোনো বিরোধ দেখা দিলে ভাড়াটিয়াদের স্বার্থরক্ষায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ভাড়া নির্ধারণে কমিশন একটি আইন তৈরি করবে। দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়ানো যাবে না। মোট ভাড়া ১০ শতাংশের বেশি হবে না। বাড়িভাড়া নিয়ে কালোবাজারি রোধ করতে হবে।
সংবিধানের আলোকে প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শহরের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ ভাড়াটিয়া। আয়ের সিংহভাগই ভাড়ার পেছনে ব্যয় হয়। এর ফলে নাগরিকরা অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ব্যয় করতে পারেন না। কমিশনের সুপারিশের আলোকে নাগরিকদের আবাসন ব্যবস্থার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আরো বলা হয়েছে, আইন তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত ১৯৯১ সালের আইনটি কার্যকর থাকবে।
এ ছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডে রেন্ট কনট্রোলার (ভাড়া নিয়ন্ত্রক) নিয়োগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত বলেছেন, কোনো ভাড়াটিয়াকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হলে বা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলে ভাড়াটিয়ার অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
রায়ের পর রিটকারীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, মামলাটি চলমান থাকবে। যেকোনো প্রতিকারের জন্য আবেদনকারীরা আবার আদালতের কাছে প্রতিকার চাইতে পারবেন।
২০১০ সালের ২৫ এপ্রিল ভাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ কার্যকরের নির্দেশনা চেয়ে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ একটি রিট দায়ের করে। পরে ১৭ মে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আইন ও বিধি-বিধান কার্যকর করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়। পাঁচ বছর পর আজ সেই রুলের নিষ্পত্তি করে রায় দিলেন হাইকোর্ট।

জাকের হোসেন