দুই নেতাকে পদ, ৫২ দিন পর খুলল বিএনপি কার্যালয়ের তালা
নতুন কমিটিতে আন্দোলনকারী দুই নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ায় ৫২ দিন বন্ধ থাকার পর খুলে দেওয়া হয়েছে রাজশাহী মহানগর বিএনপির কার্যালয়ের তালা। আজ শনিবার দুপুরে কার্যালয়ের তালা খুলে দেন রাজশাহী বিএনপি রক্ষা কমিটির নেতৃত্বদানকারী নজরুল হুদাসহ নেতাকর্মীরা।
এর আগে কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজশাহী বিএনপি রক্ষা কমিটি গঠন করে নতুন কমিটির বাদ পড়া নেতারা দলীয় কার্যালয়টি তালাবদ্ধ করেন।
এরপর বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান মিনুসহ নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে ভেদাভেদ ভুলে দলের স্বার্থে সবাই একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। তবে এ সভায় মহানগর বিএনপির নতুন সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল অনুপস্থিত থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দলীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, বুলবুল গতকাল শুক্রবার ঢাকার উদ্দেশে রাজশাহী ছেড়ে যান।
মিজানুর রহমান মিনুর পিএস হিসেবে পরিচিত নগরীর মতিহার থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক ডিকেন শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন, রাজশাহী মহানগর বিএনপির চলমান সংকট নিরসনে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে রাজশাহী মহানগর বিএনপির চার সদস্যবিশিষ্ট নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
কমিটির সভাপতি হিসেবে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, সিনিয়র সহসভাপতি নজরুল হুদা, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন ও এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান পিন্টুর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এর আগে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বুলবুল ও মিলন থাকলেও সিনিয়র সহসভাপতি ও এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
এদিকে, মহানগর বিএনপির এ দুটি পদে পরিবর্তন আসায় মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের অনুসারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এর আগে গত ২৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার বিএনপির কেন্দ্রীয় সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাজশাহী মহানগর বিএনপির ২১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। সে সময় সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে বুলবুলের অনুসারী নজরুল ইসলাম খোকা এবং এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে মামুন অর রশিদের নাম ছিল কমিটিতে।
বর্তমানে এ দুটি নাম প্রত্যাহার করে ওই দুটি পদে নজরুল হুদা ও পিন্টুর নাম ঘোষণা করায় বুলবুল সমর্থকরা হতাশ হয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, মিজানুর রহমান মিনু মহানগর বিএনপির ওপর তাঁর একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে প্রভাব খাটিয়ে এ দুটি পদে পরিবর্তন এনেছেন।
তবে মতিহার থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক ডিকেন বলেন, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সংকট নিরসনে মিজানুর রহমান মিনু, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ও অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসনের সঙ্গে তাঁর গুলশান কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজশাহীর ওই তিন নেতাকে মহানগরীর নতুন কমিটি নিয়ে সৃষ্ট সংকট নিরসনের নির্দেশ দেন। খালেদা জিয়ার নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই মিজানুর রহমান মিনু এ উদ্যোগ নেন। তবে শনিবার কার্যালয়ের তালা খোলার সময় বুলবুলের অনুপস্থিতির বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এর আগে কেন্দ্র থেকে ঘোষিত কমিটিতে মহানগর বিএনপির সিনিয়র নেতা নজরুল হুদাসহ অন্য নেতাদের পদ না দেওয়ার প্রতিবাদে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন পদবঞ্চিত নেতারা। তাঁরা ওইদিন রাতে একটি সংবাদ সম্মেলন করে কেন্দ্র থেকে ঘোষিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
ওই সময় সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন, কেন্দ্র থেকে বিএনপির যে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে তাতে দলের অনেক সিনিয়র ও ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া যারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলেছে এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে দলের কোনো কর্মসূচিতে ছিল না, তাদের স্থান দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে বিএনপি অফিস তালাবদ্ধ ছিল এবং কেন্দ্রীয় কোনো কর্মসূচি দলীয় কার্যালয়ে পালিত হয়নি। বিষয়টি নিরসনের জন্য একাধিকবার বৈঠক করেও কোনো সুরাহা না হলে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন।
এ ব্যাপারে মহানগর বিএনপি রক্ষা কমিটির নেতা নজরুল হুদা বলেন, ‘মিজানুর রহমান মিনু দীর্ঘ সময় থেকে রাজশাহী বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন। তিনিই বিএনপির দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন। তাই মিজানুর রহমান মিনুকে চলমান সংকট নিরসনের নির্দেশ দিয়েছেন দলীয় চেয়ারপারসন। আর মিনুর ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা বিএনপি কার্যালয়ের তালা খুলে দিয়েছি।’
নজরুল হুদা আরো বলেন, ‘রাজশাহী মহানগর বিএনপি ১৭১ সদস্যবিশিষ্ট। আমরা আশা করছি আগামীতে কমিটিতে যাঁরা স্থান পাবেন, তাঁরা হবেন বিএনপির জন্য নিবেদিত। আর ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করে যদি অন্যদের স্থান দেওয়া হয়, তাহলে রাজশাহী মহানগর বিএনপি রক্ষা কমিটি আবার কার্যালয় অবরুদ্ধসহ কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করবে।’
অপরদিকে, বুলবুলের সমর্থক মহানগর বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ও এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তনের মাধ্যমে মূলত বুলবুলপন্থীদের পরাজয় ঘটেছে। এর ফলে আগামীতে কমিটিতে যাঁরা স্থান পাবেন, সেখানে মিনু সমর্থকদের সংখ্যাধিক্য থাকবে। আর বুলবুল সমর্থকরা কোণঠাসা হয়ে পড়বেন। এ কারণেই রাগে ও ক্ষোভে বুলবুল গতকালের বৈঠকে অনুপস্থিত ছিলেন।
এ ব্যাপারে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের সঙ্গে বেশ কয়েকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে মিজানুর রহমান মিনু বলেন, দলের প্রধান খালেদা জিয়ার নির্দেশেই চলমান সংকট নিরসন করা হয়েছে। রাজশাহী মহানগর বিএনপিতে কোনো বিভক্তি বা ভেদাভেদ নেই বলে দাবি করেন তিনি।

শ. ম সাজু, রাজশাহী