ঝুড়ি এখন তলাবিহীন নয়, উন্নয়নে ভরপুর : প্রধানমন্ত্রী
একসময় যে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে ‘বটমলেস বাস্কেট (তলাবিহীন ঝুড়ি)’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল, সেই বাংলাদেশ এখন উন্নয়নে ভরপুর বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে বলেছেন, বাংলাদেশ এখন আর বটমলেস বাস্কেট নয়। ঝুড়ি এখন উন্নয়নে ভরপুর।
urgentPhoto রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দেওয়া এক নাগরিক সংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ভারতকে ধন্যবাদ জানান।
ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নসহ সরকারের সাফল্যের জন্য নাগরিক কমিটি সরকারপ্রধানকে এ সংবর্ধনা দেয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক কমিটির সভাপতি সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। বিকেল ৪টার পরে জাতীয় সংগীত ও ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সূচনা বক্তব্য রাখেন সৈয়দ শামসুল হক। পরে তাঁর রচিত ও আলাউদ্দিন আলীর সুরে একটি মর্ম সংগীত পরিবেশন করা হয়। সংগীত শেষে নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নীপার নেতৃত্বে একটি দলীয় নৃত্য পরিবেশন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে সংবর্ধনা মঞ্চে উপস্থিত হন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে অভিজ্ঞানপত্র পাঠ করেন। এর আগে শেখ হাসিনার হাতে নৌকার প্রতিকৃতির স্মারক তুলে দেন নাগরিক কমিটির সভাপতি সৈয়দ শামসুল হক। আর অভিজ্ঞানপত্র পাঠের পর কাঠের ওপর শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি সম্বলিত একটি স্মারক আওয়ামী লীগ সভাপতির হাতে তুলে দেন আনিসুজ্জামান।
‘সম্মাননা জনগণকে উৎসর্গ করছি’
নাগরিক কমিটির দেওয়া সংবর্ধনা দেশবাসীর প্রতি উৎসর্গ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আজ যে সম্মাননা আপনারা আমাকে দিয়েছেন তা আমার প্রাপ্য না, এটার প্রাপ্য হচ্ছে বাংলার মানুষ, বাংলাদেশের জনগণ। তাই আমি এ সম্মাননা বাংলার জনগণকে উৎসর্গ করছি।’
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘জাতির জন্য যে কোনো আত্মত্যাগের জন্য আমি প্রস্তুত আছি। বাঙালি জাতির জন্য আমি সব কিছু করব। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বসভায় মর্যাদার সাথে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণের শুরুতে বাংলাদেশ গঠনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃত করে তাঁর মেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মহৎ কাজের জন্য মহান ত্যাগের প্রয়োজন। ভোগে নয়, ত্যাগেই রয়েছে সবচেয়ে বড় অর্জন। সবাইকে ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি ভয় পাই না। একদিন যখন জন্মেছি, মরতে তো হবেই। স্বজনদের হারিয়েই তো এতদিন বেঁচে আছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে যা যা করার দরকার করব, দেশে ফিরে এই প্রতিজ্ঞা নিয়েছি। এ দেশের জন্যই আমার বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজন জীবন দিয়েছেন।’
‘ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা’
স্থলসীমান্ত চুক্তির বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হয়। পরে ৭৪-এ বাংলাদেশ সীমান্ত বিল পাস করলেও ভারতে দীর্ঘ ৪০ বছর পর সংবিধান সংশোধন করে সর্বসম্মতিক্রমে তা পাস করে। আমি দেশবাসীর পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধান করতে চাই। এই অঞ্চলের সমৃদ্ধির জন্য এবং বাংলাদেশের উন্নতির জন্য প্রতিবেশীদের সাথে সমাধান চাই।’
২০০৯ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা রূপকল্প ঘোষণা করেছি। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে যে অগ্রযাত্রার সূচনা করেছিলাম, তা ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ভূলুণ্ঠিত হয়ে যায়।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলার মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে ২০০৯ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়ে আমাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে। সেই সুযোগ দিয়েছে বলেই আমরা মানুষের সেবা করতে পেরেছি।’
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রূপকল্প’
দেশের সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের নীতি হচ্ছে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ। সেই গ্রামের অবহেলিত মানুষটিরও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তার সেই অধিকার রক্ষাই আমাদের লক্ষ্য। স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। প্রতিটি মানুষ তার অধিকার পাবে।’
‘একটি জাতির জীবনে কোনো দিকদর্শন না থাকলে সে জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাঙালি জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য রূপকল্প ঘোষণা করেছি। এখন তা বাস্তবায়নে কাজ করছি।’
‘দারিদ্র্যই বাংলাদেশের একমাত্র শত্রু’-উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই দারিদ্র্য থেকে আমাদের দেশকে মুক্ত করতে হবে।’ দেশের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সরকার দারিদ্র্য নির্মূলে সফল হবে বলে আশাবাদও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীকে ‘দেশরত্ন’ উপাধি দিল নাগরিক কমিটি
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় নাগরিক কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘দেশরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। নাগরিক কমিটির সভাপতি ও লেখক সৈয়দ শামসুল হক তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করেন।
সৈয়দ শামসুল হক বলেন, “আজ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামের প্রারম্ভে আবশ্যিকভাবে ‘দেশরত্ন’ শব্দটি ব্যবহার হবে। আমি সবার পক্ষ থেকে তাঁকে ‘দেশরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করছি।” এ সময় উপস্থিত জনতা করতালির মাধ্যমে এই উপাধিকে স্বাগত জানায়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দুপুরের পর থেকেই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বৃষ্টি উপেক্ষা করেই দলে দলে মিছিল নিয়ে এই নাগরিক সংবর্ধনায় যোগ দেয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাদ্য বাজিয়ে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা সংবর্ধনাস্থলে আসেন। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে বিশাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন খাতে সরকারের সাফল্য তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, শিক্ষাবিদ অনুপম সেন, অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান, ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান।
তাঁদের বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে সংগীত পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাসহ ঢাকার দুই মেয়র, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী নেতা, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী, ঢাকা এবং আশপাশের জেলাগুলোর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নসহ সরকারের সাফল্যের জন্য আজ শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নাগরিক কমিটির দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : এনটিভি

অনলাইন ডেস্ক