করোনা : অবহেলা নয়, প্রয়োজন সামাজিক-মানসিক সহায়তা
করোনাভাইরাসে স্থবির হয়ে পড়েছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। বন্ধ আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। থমকে গেছে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানসহ নানান সামাজিক কর্মকাণ্ড। তবে সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে একে অপরের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ক।
করোনাভাইরাস মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। তবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিজেকে সম্পূর্ণ একা রাখলে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে সুস্থতা ফিরে আসে। অথচ এ রোগ যাদের শরীরে দেখা দিয়েছে তাদের সামাজিকভাবে অনেকটাই অবহেলা করা হয় বলে মনে করেন করোনার থাবা থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আসা রোগীরা।
মানিকগঞ্জ শহরে বসবাসকারী ভাড়াটিয়া হাসিনা বেগম (৬৫) বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর কোনো আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব দেখাও করেননি, এমনকি খোঁজও নেয়নি। সারা দিন বাসার দরজায় তালা দেওয়া থাকত। বাজার করার মতো কেউ ছিল না। ওই দুঃসময়ে কাউকে কাছে পাইনি। কোনো রকম পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ছাড়াই আলু সিদ্ধ দিয়ে ভাত খেয়ে কষ্টে সময় পার করেছি।’
‘১৪ দিনের বন্দি জীবনের দুশ্চিন্তা ও আতঙ্ক এখনো মনের ভেতরে রয়ে গেছে’, বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন করোনার থাবা থেকে ফিরে আসা হাসিনা বেগম।
এদিকে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বেতিলা মিতরা ইউনিয়নের ভাদুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মো. শহীদ মিয়া শোনালেন তাঁর করোনায় আক্রান্তের দুঃসময় অতিক্রান্তের কথা। শহীদ বলেন, “জেলার প্রথম করোনা রোগী হিসেবে যখন আমি আক্রান্ত হই, সত্যি বলতে কী প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। পুরো এলাকা জুড়ে প্রশাসন লকডাউন দিয়ে দিল। আমার পরিবারের ওপর তখন যেন তুফান বইছে। আমাকে ঢাকার কুর্মিটোলা হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এদিকে বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের বাকি সদস্যরা একটা অস্থিরতায় সময় পার করেছে। বর্তমানে আমি সুস্থ। কিন্তু যখন ১৪ দিন পর করোনা নেগেটিভ নিয়ে বাড়ি এলাম, এলাকার লোকজন আমাকে আমার বাড়ির উঠানে দেখলেও বলতো, ‘আপনি বাইরে কেন? ঘরে থাকুন।’ সেই সময় লোকজনের নানান হুমকিও আমাকে সহ্য করতে হয়েছে।”
রোগ আছে, রোগের প্রতিকারও আছে। তাই বলে রোগীকে তুচ্ছভাবে দেখার কিছু নেই। এ রোগ হওয়া অপরাধ নয়। তবু আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে আলাপকালে উঠে আসে এ রোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা।
এ বিষয়ে জেলা সদর হাসপাতালের একজন সেবিকা কাকলী চৌধুরী (সেঁজুতি), যিনি করোনাকে যুদ্ধ হিসেবে বেছে নিয়ে রোগীর পাশে থেকে সেবা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘করোনা একটি ছোয়াচে রোগ। সঠিক নিয়মে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই এ রোগ বা ভাইরাস যাই বলি না কেন, সুস্থ হওয়া সম্ভব।’
‘কারো করোনা পজিটিভ দেখা দিয়েছে, তাই তার কাছে যাওয়া যাবে না- এ ভাবনাটা আমার কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। আমি মনে করি, রোগ আছে রোগের প্রতিকারও আছে।’ বলছিলেন সেবিকা কাকলী।
জান্নাত আরা শিমুল, যিনি চার বছর ধরে মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে রোগীর সেবাদানে কর্তব্যরত। তিনিও করোনা পজিটিভ হয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আলাপকালে জানা গেল, করোনায় আইসোলেশনে থাকা ১৪ দিনের সময় তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও আশেপাশের লোকজনের সামাজিক দূরত্ব ও আচার-ব্যবহার নিয়ে। শিমুল বলেন, ‘১৪ দিন ধরে লকডাউন। না পারি ঘর থেকে বের হতে, না পারি জানালার পাশে দাঁড়াতে। আমার বাসার জানালা ঘেষে পাশের ফ্ল্যাটের ছাদ আছে, ওই ছাদেও কোনো লোকজন আসেনি। এমন কি আমার আশেপাশের প্রতিবেশীও কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি বা ফোনও দেয়নি। এ ছাড়া আমার পাশের ফ্ল্যাটের পরিবারও বাসা ছেড়ে দিয়েছেন এবং চলেও যাবেন। কারণ আমি ও আমার মায়ের করোনা পজিটিভ। এভাবেই আমরা সমাজের কাছে অবহেলিত হয়েছি।’
জান্নাত আরা শিমুল জানান, করোনা পজিটিভ হওয়ার আগে তিনি যখন ফ্ল্যাটের নিচে থাকা দোকানগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করতেন তখন দোকানিরা তাঁর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত খোঁজ-খবর নিতেন। কিন্তু করোনায় আক্রান্তের পর সামাজিক সম্পর্কের চিত্রটা পাল্টে যায়। এখন তাদের সঙ্গে দেখা হয় ঠিকই কিন্তু কথা হয় না। তারা দূরত্বে থাকে। এ যেন দূরত্বের চেয়েও দূরত্বে অবস্থান করা।’
অনেকটা হতাশ হয়েই শিমুল জানতে চাইলেন, ‘আমরা নার্সরা তো রোগীদের সেবা করতে গিয়েই অসুস্থ হই। তারপরও মানুষ কেন যে আমাদের অবহেলা করল?’
অবহেলা নিয়েই করোনায় আক্রান্ত অনেক রোগীকে জীবনযাপন করতে হয়েছে। এমনকি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ করে দিয়েছে। এমন একজন জেলা সদরের গড়পাড়ার সামসুল আলম।
সামসুল আলম পেশায় একজন চা বিক্রেতা। তাঁর শরীরে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে প্রশাসন তাঁর বাড়ি লকডাউন করে তাঁকে ১৪ দিন নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে থাকার পরামর্শ দেয়। সে মোতাবেক সামসুল ১৪ দিনের পরিবর্তে টানা ২৩ দিন নিজ বাড়িতেই অবস্থান করেছেন। আইসোলেশনে থাকার সময় প্রশাসনের কাছ থেকে সহযোগিতা পেলেও কোনো ধরনের সহযোগিতা পাননি প্রতিবেশীদের কাছ থেকে।
সামসুল আলম বলেন, “আমার যখন করোনা দেখা দিল, তখন তো বাড়িতে থাকতে হইতো। একা একটা ঘরে থাকতে থাকতে ভালো লাগতো না। শরীরটা অবশ হইয়্যা গেছিল। হাত-পায়ে পানি আইছিল। বাড়ি থেকে যখন আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার জন্য এলাকার মোড়ের দোকানে হাঁটতে যাইতাম, তখন সবাই বলতো ‘তুমি ঘর থেকে বাইর হইছো ক্যান? বাড়ি যাও’। আমি তখন বলতাম, আমার তো করোনা নেগেটিভ আইছে। কিন্তু তারা (প্রতিবেশীরা) সে কথা বিশ্বাস করতো না। কী যে দুঃসহ সময় পার করছি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।”
একান্ত আলাপকালে সামসুল আলম এও বলেন, ‘যদি তখনকার সময়ে কিছু কিছু প্রতিবেশী কেমন আচরণ করছে তা এখন আপনাদের কাছে বলি, তাহলে নিজের এলাকার সম্মান থাকবে না। তাই যতটুকু বললাম ততটুকু নিয়েই বুঝে নেন।’
তবে সামসুল আলম মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন যত দ্রুত সম্ভব এই করোনাভাইরাস দেশ থেকে তুলে নেন এবং কাউকে যেন এমন রোগ আর না দেন।
এদিকে সামাজিকভাবে হেয়পতিপন্ন হওয়া করোনায় আক্রান্ত থেকে ফিরে আসা রোগীদের সম্পর্কে মানিকগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘করোনা পজিটিভ রোগী যারা আছেন তাদের আসলে সামাজিকভাবে হেয় করে দেখার কোনো উপায় নেই। বরং সমাজের অন্যান্যদের উচিত তাদেরকে সামাজিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা এবং তাদের মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়া প্রতিবেশীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।’
ডা. আরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘করোনা একটি মারাত্মকভাবে ছোঁয়াচে রোগ। তবে এ রোগের মৃত্যুর হার অন্যান্য রোগের তুলনায় খুবই কম। তাই এ রোগ দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নাই। হাঁচি, কাশি ও থুতু থেকে সাধারণত এ রোগ ছড়ায়। তবে ডাক্তারি পরামর্শ মতে মাস্ক পরে থাকলে ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।’

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ