‘হায় হোসেন’ ধ্বনিতে কাঁদল মানিকগঞ্জ, গড়পাড়া ইমামবাড়ীতে হাজারো ভক্তের শোকসমাবেশ
কারবালার বেদনাবিধুর স্মৃতি, আশুরার গভীর শোক এবং হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আপসহীন ও মহান আত্মত্যাগের চেতনায় শুক্রবার (২৬ জুন) যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো মানিকগঞ্জ। এই উপলক্ষে জেলার শতবর্ষের ঐতিহ্য বহনকারী গড়পাড়া ইমামবাড়ী দরবার শরীফে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে পবিত্র ১০ মহররম। কাসেদ পদযাত্রা, মার্সিয়া, মাতম এবং দেশ-বিদেশ থেকে আসা হাজারো আশেকান ও ভক্ত-অনুসারীর উপস্থিতিতে পুরো ইমামবাড়ী এলাকা এক আবেগঘন শোকসমুদ্রে পরিণত হয়।
এদিন সকাল থেকেই মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও দেশের দূর-দূরান্ত থেকে সর্বস্তরের হাজার হাজার ভক্ত ও পুণ্যার্থী দলে দলে গড়পাড়া ইমামবাড়ীতে এসে সমবেত হতে থাকেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ ধ্বনি, কারবালার কারুণ্যগাথা এবং মার্সিয়ার বেদনাকাতর সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো জনপদ। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে দরবার শরীফে কারবালার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর অনন্য আত্মত্যাগ এবং ইসলামের সত্য ও ন্যায়ের আদর্শ নিয়ে এক বিশেষ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
গড়পাড়া ইমামবাড়ীর খাদেম ও পীরজাদা শাহ আরিফুর রহমান বাবু দরবারের ঐতিহ্য তুলে ধরে বলেন, গত ১৯২১ সালে হযরত শাহ খলিলুর রহমান (রহ.) এই ঐতিহাসিক ইমামবাড়ীটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিকভাবে মহররমের এই শোক কর্মসূচি পালন হয়ে আসছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই গৌরবময় ঐতিহ্যকে ধরে রাখার নিরন্তর চেষ্টা চলছে। তিনি আরও জানান, প্রতি বছর দরবারের পক্ষ থেকে ৩০টি বিশেষ কাসেদ দল মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে কারবালার বিয়োগান্তক ইতিহাস, হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ এবং সত্য ও ন্যায়ের চিরন্তন বার্তা সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই প্রচারের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
শাহ আরিফুর রহমান বাবু আরও জানান, পবিত্র মহররমের প্রথম দিন থেকেই গড়পাড়া ইমামবাড়ীতে দিনরাত পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল, মার্সিয়া ও মাতমের আয়োজন করা হয়। শক্রবার আশুরার মূল দিনে এসে সেই শোকের আবহ যেন আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও বিকেলে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কারবালার একটি প্রতীকী তাজিয়া বা শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এবার বহর বা শোকযাত্রায় কোনো ধরনের ধারালো অস্ত্রের প্রদর্শন রাখা হয়নি।
অনুষ্ঠানে আগত ভক্ত ও বিশিষ্টজনদের মতে, কারবালার নির্মম ঘটনা কেবল ইতিহাসের কোনো সাধারণ অধ্যায় নয়; বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, সমাজে সত্য প্রতিষ্ঠা এবং ত্যাগের এক চিরন্তন ঐশ্বরিক শিক্ষা। পীরজাদা শাহজাদা রহমান বাঁধন বলেন, আশুরা পালন শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি আমাদের ঈমানি দায়িত্বের অংশ। কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ মানবজাতিকে সত্য, ন্যায় এবং আদর্শের পথে অটল থাকার শিক্ষা দেয়। কিয়ামত পর্যন্ত যেন মানুষ আহলে বাইতের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা লালন করতে পারে এবং ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করতে পারে—এটাই সবার মূল প্রত্যাশা। সব মিলিয়ে গড়পাড়া ইমামবাড়ীর আশুরা। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজনই নয়, বরং বিশ্বাস, মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ