‘রাবিতে খুন হয়ে কেউ চিৎ, কেউ উপুড় হয়ে পড়ে থাকে’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার বলেন, ‘যে লিপুর সঙ্গে আমরা-আপনারা সারা দিন গান গেয়েছি, আড্ডা দিয়েছি, তাঁর লাশ একটা ড্রেনের ময়লা-পচা পানির মধ্যে পড়ে ছিল। শরীর উলঙ্গ। রেজাউল করিম সিদ্দিকী উপুড় হয়ে পড়েছিলেন। পাশ দিয়ে রক্তের স্রোত বয়ে গেছে। আকতার জাহানের লাশ তিনদিন ধরে জুবেরি ভবনে পড়ে ছিল। তাঁর শরীরে পিঁপড়া ওঠে। এভাবে কেউ চিৎ হয়ে পড়ে থাকে, কেউ উপুড় হয়ে পড়ে থাকে। এটা বিশ্ববিদ্যালয়!’
রাবি শিক্ষক আকতার জাহান জলি, শিক্ষার্থী লিপুসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৩ বছরের ইতিহাসে ৪৬ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ বিক্ষোভ মিছিল ও ছাত্রসমাবেশ করে। আজ বুধবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালিত হয়।
সমাবেশে কাজী মামুন হায়দার আরো বলেন, ‘এখন এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চলবে কি চলবে না এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীতে শখানেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গবেষণা নেই, সংস্কৃতি চর্চা নেই। চারদিকে আছে শুধু বাণিজ্যিকীকরণের ছাপ। আর একদিকে আছে শুধু হত্যাকাণ্ড। দুটি সমানতালে চলছে। এখন আপনারাই সিদ্ধান্ত নিন কোনটার সঙ্গে থাকবেন।’
এ সময় বিভাগের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে বলেন, ‘মৃত্যু, মানববন্ধন, সমাবেশ, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, আবার আরেকটি হত্যা। আবার বিচার দাবিতে আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় আর কতদিন এভাবে চক্রাকারে হত্যা হতেই থাকবে? আর কতদিন আমাদের বিচার দাবিতে এভাবে রাস্তায় এসে দাঁড়াতে হবে। আমরা এ প্রশ্নের জবাব চাই।’
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সভাপতি প্রদীপ পাণ্ডে আরো বলেন, ‘এই যে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ আজ জ্বলে উঠেছে, আপনারা লিপু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া যদি এভাবে কালক্ষেপণ করতে থাকেন, তবে আমার পক্ষে হয়তো তা আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।’

শিক্ষার্থী সমাবেশে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিহুর রহমান বলেন, যার ক্ষমতা আছে, সে শিক্ষক-শিক্ষার্থী যাকে খুশি হত্যা করে পার পেয়ে যাবে। অনেক মাৎস্যন্যায়ের মতো পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। আর আমরা পড়াশোনা বাদ দিয়ে এভাবে আন্দোলন করব। এভাবে চলতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, লিপু হত্যার বিষয়ে রুমমেটের থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত পাওয়া গেছে। তাহলে আর দেরি কেন?
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন সমাজকর্ম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রবিউল ইসলাম, ইংরেজি বিভাগের সভাপতি এ এফ এম মাসউদ আখতার, নবাব আবদুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষ বিপুল কুমার বিশ্বাসসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিভিন্ন বিভাগ, হল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠন এ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশ করে।
গত ২০ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আবদুল লতিফ হলের ডাইনিংয়ের পাশ থেকে লিপুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিন সন্ধ্যায় লিপুর চাচা মো. বশির বাদী হয়ে রাজশাহী নগরীর মতিহার থানায় হত্যা মামলা করেন।
এ মামলায় লিপুর রুমমেট মনিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২৬ অক্টোবর আদালত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মনিরুলের চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে লিপু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অশোক চৌহান বলেন, ‘আমরা লিপুর রুমমেট মনিরুলের কাছ থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। আর সেই তথ্যের ভিত্তিতে এরই মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
অন্যদিকে, গত ৯ সেপ্টেম্বর শিক্ষক জলির লাশ নিজ কক্ষ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন মতিহার থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন জলির ভাই কামরুল হাসান। কিন্তু তার দেড় মাস পরেও ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট দিতে পারেনি পুলিশ।

রাবি সংবাদদাতা