গ্রীষ্মকালীন শিমের বাম্পার ফলন, হাসি ফুটেছে কৃষকের মুখে
সকাল গড়িয়ে তখন বেলা। বাঁশের মাচাজুড়ে ঝুলছে অসংখ্য কচি শিম। ক্ষেতের ভেতর ব্যস্ত কৃষক তায়জোদ আলী। এক হাতে গাছের ডাল সরিয়ে অন্য হাতে শিম তুলে নিচ্ছেন। মুহূর্তেই ভরে উঠছে তার ঝুড়ি। যত্নে গড়ে তোলা এই ক্ষেত থেকে প্রতিদিনই সংগ্রহ করছেন শিম, যা পরে চলে যাচ্ছে স্থানীয় বাজারে।
গ্রীষ্মের মৌসুমে ভালো ফলন আর আশানুরূপ দাম পেয়ে তায়জোদ আলীর মুখে এখন স্বস্তির হাসি। তার ক্ষেতের এমন সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকদের মনেও জাগছে নতুন স্বপ্ন। ধান চাষে উৎপাদন খরচ বাড়লেও প্রত্যাশিত লাভ না পাওয়ার দুশ্চিন্তার মধ্যে গ্রীষ্মকালীন শিম যেন তাদের সামনে খুলে দিচ্ছে বাড়তি আয়ের নতুন পথ। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছিট আলোকডিহি ডাক্তারপাড়া এলাকায় ঢুকতেই চোখে পড়ে এসব সবুজের সমারোহ।
হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের গ্রীষ্মকালীন শিম চাষে এমনই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহায়তায় কয়েকজন কৃষকের হাত ধরে শুরু হওয়া এ চাষ এখন ছড়িয়ে পড়ছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। ভালো ফলন ও বাজারদর পাওয়ায় বিকল্প ফসল হিসেবে শিম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন আরও অনেক কৃষক।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর ধরে ধান উৎপাদনের খরচ বাড়লেও অনেক সময় সে তুলনায় বাজারদর পাওয়া যায় না। এতে লাভ কমে যাওয়ায় বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন তারা। কৃষি বিভাগের পরামর্শে এবার কেউ কেউ গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ শুরু করেন। তাদের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় এই আবাদ নিয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন চাষিরা।
আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের ছাতিয়ানগড় গ্রামের আলোকডিহি এলাকার কৃষক তায়জোদ আলী জুলাই মাসে হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের শিমের বীজ রোপণ করেন। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গাছে শিম আসতে শুরু করে। এরপর থেকে নিয়মিত শিম সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করছেন তিনি।
তায়জোদ আলী বলেন, এ মৌসুমে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গাছে ভালো শিম ধরেছে। পাইকারের কাছে প্রতি কেজি ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি। অক্টোবর মাস পর্যন্ত শিম পাওয়া যাবে। আশা করছি, খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ হবে।
একই এলাকার কৃষক ময়েজ উদ্দিনও কৃষি বিভাগের পরামর্শে এ জাতের শিম চাষ করেছেন। ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। ময়েজ উদ্দিন বলেন, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মমিনুল বিন আমিনের পরামর্শে এ শিম চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে, দামও পাচ্ছি। আমাদের ক্ষেত দেখে এলাকার অন্য কৃষকরাও এখন আগ্রহী হচ্ছেন।
অন্যের ক্ষেতের সাফল্য দেখে নিজেও শিম চাষে আগ্রহী হন স্থানীয় কৃষক মো. সাদেক মিয়া। সুমজ আলী ও সনজব আলীর শিম চাষ দেখে উৎসাহিত হয়ে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেন তিনি। পরে ৩০ শতক জমিতে এ জাতের শিমের আবাদ করেন।
সাদেক মিয়া বলেন, পাইকাররা ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি দরে শিম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাজারে আবার ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ফলন ভালো হয়েছে। অক্টোবর পর্যন্ত বিক্রি চলবে। এতে ভালো আয় হবে বলে আশা করছি।
কৃষকদের এ সাফল্যের পেছনে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও ভূমিকা রাখছে। ছাতিয়ানগড় ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মমিনুল বিন আমিন বলেন, শীতকালে বিভিন্ন জাতের শিমের চাষ হলেও গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতটি ভালো ফলন দিতে পারে। এ জাতের শিম গ্রীষ্ম ও বর্ষার আবহাওয়া সহিষ্ণু।
তিনি বলেন, কৃষকদের বীজ রোপণ, মাচা তৈরি, পরিচর্যা ও পোকামাকড় দমনের বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পোকামাকড় দমনে কৃষকরা ইয়োলো ট্র্যাপ ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি বেশি পরিমাণে গোবর ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ কম রাখার পাশাপাশি ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চলতি মৌসুমে ২০ শতক জমিতে হাইব্রিড আর্লি-৪৫ জাতের গ্রীষ্মকালীন শিমের আবাদ করা হয়েছে। এ জন্য কৃষকদের বীজ, সার, ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় শিম চাষ দেখে উৎসাহিত হয়ে কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে আরও প্রায় ১ একর ৪০ শতক জমিতে এ জাতের শিমের আবাদ করেন। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৭ থেকে ৮ একরের বেশি জমিতে গ্রীষ্মকালীন শিম চাষ হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইয়াসমিন আক্তার বলেন, খানসামায় আগে গ্রীষ্মকালীন শিমের চাষ তেমন হতো না। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের উদ্যোগে কয়েকজন কৃষককে দিয়ে এ চাষ শুরু হয়। এবার ফলন ভালো হয়েছে এবং কৃষকরা বাজারে ভালো দামও পাচ্ছেন। তাদের সাফল্য দেখে অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হচ্ছেন। ভবিষ্যতে এ আবাদ আরও বাড়বে বলে আশা করছি।
ধান চাষের পাশাপাশি বিকল্প ফসল হিসেবে গ্রীষ্মকালীন শিম এখন খানসামার কৃষকদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অল্প সময়ের মধ্যে ফলন পাওয়া, বাজারে ভালো দাম এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ- সব মিলিয়ে এ চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। আঙ্গারপাড়ার কয়েকটি ক্ষেতের সাফল্য ইতোমধ্যে অন্য কৃষকদেরও উৎসাহিত করছে।

মাসুদ রানা, দিনাজপুর (বীরগঞ্জ-খানসামা)