স্মরণকালের সবচেয়ে ছোট বহর নিয়ে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্ক যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই তাঁর প্রথম জাতিসংঘ সফর এবং সাধারণ পরিষদের বিশ্বমঞ্চে প্রথম ভাষণ। সফরকালে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট এবং বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে দেশের অবস্থান তুলে ধরবেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর ২১ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে। চারদিনের এই সফর শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁর দেশের উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করার কথা রয়েছে। প্রথমে সফরটি ৯ দিনের এবং এর সঙ্গে সান ফ্রান্সিসকোর সিলিকন ভ্যালি সফর যুক্ত থাকার কথা থাকলেও পরে কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করা হয়। সান ফ্রান্সিসকো সফরও বাতিল করা হয়েছে।
জাতিসংঘ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী আগামী বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেবেন। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক শুরু হবে ২২ সেপ্টেম্বর। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ‘আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’।
ভাষণে থাকবে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়ের বার্তা
বিশ্বনেতাদের সামনে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক রূপান্তর, নতুন সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ সম্ভাবনা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং জলবায়ু অর্থায়নের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে আন্তর্জাতিক সংঘাতের শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধান, বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলতে পারেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বিশ্বনেতাদের সামনে তিনি নতুন বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।
সফরে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি থাকবে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। নিউইয়র্কে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে একটি সাইড ইভেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানানো হবে।
কক্সবাজার ও ভাসানচরে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি না হওয়া এবং রাখাইনের অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতিও আলোচনায় আসতে পারে। বাংলাদেশ এই সংকটকে কেবল মানবিক সমস্যা হিসেবে নয়, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তুতি
জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে কয়েকজন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে সম্ভাব্য বৈঠকগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অনেক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষ মুহূর্তে নির্ধারিত হওয়ায় নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পরও প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানা গেছে ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পৃথক বৈঠক হবে কি না—এ নিয়েও সবারই আগ্রহ রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের বৈঠক সাধারণত শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত হয়। ফলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কোনো বৈঠক নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ছোট হচ্ছে সফরসঙ্গী দল
এবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী দলও অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে তুলনামূলকভাবে ছোট রাখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইং, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতিক এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাসহ প্রাথমিকভাবে ২৪ জনের একটি দলের কথা জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত সফরসঙ্গীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৩৫ জন হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্র ও জনগণের অর্থ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সফরের সময় এবং প্রতিনিধিদলের আকার কমানো হয়েছে। সান ফ্রান্সিসকো সফর বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকেও সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হচ্ছে না বড় নাগরিক সংবর্ধনা
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে বড় পরিসরে নাগরিক সংবর্ধনা আয়োজনের আলোচনা চলছিল। ২৫ সেপ্টেম্বর ম্যানহাটনের ম্যারিয়ট মারকুইস হোটেলে অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী বড় ধরনের নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নিচ্ছেন না।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এতে সম্মতি দেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ব্যয়বহুল সংবর্ধনার পরিবর্তে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম ও কূটনৈতিক বৈঠককে সফরের প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে নিউইয়র্কে বিএনপি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ম্যানহাটনের বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের সমাগম হতে পারে। নিরাপত্তাজনিত কারণে বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর আগমন ও চলাচলের বিস্তারিত সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশের জন্য ব্যতিক্রমী অধিবেশন
এবারের জাতিসংঘ অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে একই সময়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন এবং বাংলাদেশেরই একজন কূটনীতিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল ও মর্যাদাপূর্ণ মুহূর্ত।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের সঙ্গে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি যোগসূত্র রয়েছে। তাঁর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন। তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবার সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেন। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে খালেদা জিয়া সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে মোট পাঁচবার বক্তব্য দিয়েছেন।
আগামী বৃহস্পতিবার তারেক রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে তিনি জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বক্তব্য দেবেন। একই সঙ্গে এটি হবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বড় বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক উপস্থিতি।
সফরের দিকে নজর প্রবাসীদের
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কেউ সফরটিকে নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে দেখছেন। আবার অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সমস্যা, কনস্যুলার সেবা, বাংলাদেশে বিনিয়োগ এবং ঢাকা-নিউইয়র্ক সরাসরি বিমান যোগাযোগের বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান।
তবে সফরটি সংক্ষিপ্ত হওয়ায় বড় কোনো উন্মুক্ত প্রবাসী সমাবেশের সম্ভাবনা নেই। জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং রোহিঙ্গাবিষয়ক উদ্যোগ নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর বেশির ভাগ সময় ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফরটির সাফল্য নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক এবং বাংলাদেশের প্রধান দাবিগুলোর পক্ষে কতটা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা যায় তার ওপর। বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, জলবায়ু অর্থায়ন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বার্তা বিশ্বমঞ্চে কীভাবে উপস্থাপিত হয়—সেদিকেই থাকবে সবচেয়ে বেশি নজর।

ফরিদ আলম, নিউইয়র্ক থেকে