অনলাইনে ইলিশের ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা, আটক ৪
চাঁদপুরের রূপালী ইলিশের জনপ্রিয়তা এখন আর নদী বা মাছের আড়তেই সীমাবদ্ধ নেই। ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে চাঁদপুরের ইলিশ। তবে এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি প্রতারকচক্র। ভুয়া ফেসবুক পেজ ও অনলাইন অ্যাকাউন্ট খুলে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দাম এবং নানা লোভনীয় অফারের মাধ্যমে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করছে তারা।
অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর বিকাশ, নগদ কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়। টাকা হাতে পাওয়ার পরই বন্ধ করে দেওয়া হয় ফোন নম্বর, উধাও হয়ে যায় ফেসবুক পেজ। আবার অনেক ক্ষেত্রে চাঁদপুরের ইলিশের নামে অন্য জেলার মাছ পাঠিয়েও প্রতারণা করা হচ্ছে। দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় অনেক ক্রেতাই সহজে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন না।
এ ধরনের প্রতারণায় শুধু সাধারণ ক্রেতারাই আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন না, ক্ষুণ্ন হচ্ছে চাঁদপুরের রূপালী ইলিশের দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম ও ব্র্যান্ড মূল্য। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রকৃত অনলাইন ইলিশ ব্যবসায়ীদের ওপরও। তাদের দাবি, প্রতারকদের কারণে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই এখন অনলাইনে ইলিশ কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে বৈধ অনলাইন ব্যবসাও ক্ষতির মুখে পড়ছে।
অনলাইনে ইলিশ প্রতারণার ঘটনায় চাঁদপুর, নোয়াখালী, পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ। সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) চাঁদপুর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ নড়াইলের কালিয়া থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চার প্রতারককে আটক করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১০টি মোবাইল ফোন, ৪৬টি সিম কার্ডের মধ্যে দুটি ভারতীয় সিম এবং নগদ ৭৫ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
আটকরা হলেন- নড়াইলের কালিয়া থানা এলাকার ফুরকান শেখ (২৫), চান্দু শেখ (২৫), রাতুল হোসেন নবেল (২৫) ও শহিদুল শেখ (২৩)।
পুলিশ জানায়, চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক থেকে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করে সেগুলো এডিট করে ভুয়া ফেসবুক পেজ ও হোয়াটসঅ্যাপ আইডি খুলত। এরপর ইলিশ মাছ, ফার্নিচার, জুতা, কলম, শিশুদের খেলনা ও অনলাইন চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন ও রিলস তৈরি করে বুস্ট পোস্টের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিত। ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তারা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করত। ক্রেতারা অগ্রিম টাকা দেওয়ার পরই তাদের নম্বর ব্লক করে দিত চক্রের সদস্যরা।
চাঁদপুর মাছঘাটের অনলাইন ইলিশ বিক্রেতা সাফায়েত হোসেন বলেন, অনলাইন প্রতারক চক্রের কারণে তারা খুব বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েছেন। ক্রেতারা এখনো ফেসবুকের অরিজিনাল পেজ দেখলেও বিশ্বাস করতে চান না। আবার অনেক ক্রেতা অর্ডার দিয়ে মাছ ফেরত দিচ্ছেন। এসব প্রতারক চক্রের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনলাইনে ইলিশ কেনার আগে ক্রেতাদের অবশ্যই ভিডিও কলে মাছ দেখে নেওয়া উচিত। সম্ভব হলে ক্যাশ অন ডেলিভারিতে মাছ নেওয়া উচিত।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল বারী মানিক জমাদার বলেন, গত দুই-তিন বছর ধরে অনলাইনে ইলিশের নামে প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা চাঁদপুরের ব্যবসায়ীদের ভিডিও কপি করে নিজেদের পেজে প্রকাশ করে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। প্রকৃত অনলাইন ইলিশ ব্যবসায়ীরা কখনও আগাম টাকা নেন না।
আব্দুল বারী মানিক জমাদার ক্রেতাদের উদ্দেশে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যারা অনলাইনে ইলিশ অর্ডার করেন, তারা যেন যাচাই-বাছাই করে নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই ইলিশ কেনেন। একই সঙ্গে অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদারের আহ্বান জানাচ্ছি।
চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাদিরা নূর বলেন, অনলাইন প্রতারকচক্রকে ধরতে পুলিশের টিম সবসময় কাজ করছে। ইতোমধ্যে চাঁদপুর জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে নড়াইলের কালিয়া থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজনকে আটক করেছে। একই ঘটনায় এর আগে আটক হওয়া আরও দুজনসহ এ পর্যন্ত মোট ছয়জনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

শরীফুল ইসলাম, চাঁদপুর