জন্মের পর থেকেই কারাগারে, ৬ বছর পর বাবার কাছে ফেরার অপেক্ষায় রাথী
জেলখানার লোহার খাঁচা, দুই ফুটের ব্যবধান আর চার দেওয়ালের অন্ধ কুঠুরির ভেতরেই কেটে গেছে দীর্ঘ ছয়টি বছর। ২০১৯ সালে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কামরুন নাহার মণি। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে জন্ম নেয় তার মেয়ে মোবাশ্বিরা খানম রাথী (রোজা)। জন্মের দুই দিন পর থেকেই মায়ের সঙ্গে কারাগারেই শৈশব কাটে তার। নিম্ন আদালতে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার সময় এক মাস বয়সী শিশুটি ছিল মায়ের কোলে।
দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে গতকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) হাইকোর্ট নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণা করেন। বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ ১০ আসামিকে খালাস দেন, যাদের একজন কামরুন নাহার মণি।
স্ত্রীর খালাসের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন মণির স্বামী রাশেদুল আলম খান। মেয়েকে কাছে না পাওয়ার দীর্ঘদিনের বেদনা এবং এতদিন পর তার সামনে দাঁড়ানোর উৎকণ্ঠা ফুটে উঠেছে তার লেখায়।
রাশেদুল আলম খান লিখেন, বাবা হয়েও বাবা হওয়ার স্বাদ পেলাম না আজও আমি! খুব ইচ্ছে করত রাথিকে বুকে জড়িয়ে ধরার, সুযোগ ছিল না কড়া নিরাপত্তার জন্য। জানালার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট পায়ের আঙুল ছুঁয়ে দিতাম... কাশিমপুর যাওয়ার পর ২ ফুট গ্যাপের খাঁচা, ঠিকমতো মেয়েটা দেখতেই পারত না আমাকে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত সেই নয়নজুড়ানো কালো দুটি চোখে। আমাকে চিনত না সে, চিনবেই বা কেমনে?
আগামী ২১ সেপ্টেম্বর শিশু রাথীর সাত বছর পূর্ণ হতে চলেছে। রাশেদুল বলেন, মেয়েকে ছাড়া এ পর্যন্ত ১৪টি ঈদ ও ৭টি জন্মদিন পার করেছেন তিনি। দূরত্বের কারণে বাবার প্রতি সন্তানের অনভিজ্ঞতা তাকে ব্যাকুল করে তুলছে। তিনি লেখেন, মেয়ের সামনে কীভাবে দাঁড়াব, বুঝতে পারছি না। অস্থির লাগছে। জানি না আমাকে চিনবে কিনা রাথী।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গ্রেপ্তারের পর কারাগারেই ঠাঁই হয়েছিল মণির। ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর প্রসববেদনা উঠলে কারা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তাকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন মণি। হাসপাতালে দুই দিন বাবা-মাসহ পরিবারের সান্নিধ্য পায় শিশুটি। এরপর থেকে মায়ের সঙ্গে কারাগারেই দিন কাটে তার। নিম্ন আদালতের রায় শোনার সময় এক মাস বয়সী নবজাতকও ছিল মায়ের সঙ্গে।
শিশুটির নাম রাখা হয় মোবাশ্বিরা খানম রাথী। মণির স্বামীর দাবি, নুসরাত জাহান রাফির নামানুসারে তার নাম রাখা হয়েছিল। তবে মণি মেয়েকে ‘রোজা’ নামে ডাকেন বলে জানা গেছে।
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এ মামলার ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপর আসামিরা হাইকোর্টে আপিল ও জেল আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে সোমবার দুপুরে ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ।
রায়ে তৎকালীন মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১০ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাস পাওয়া ১০ আসামির একজন কামরুন নাহার মণি।

তোফায়েল আহাম্মদ নিলয়, ফেনী