শতভাগ জিপিএ ৫ পাওয়া নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুলকে শোকজ নোটিশ
নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসে চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় শতভাগ জিপিএ ৫ অর্জনের নেপথ্যে নিয়মবহির্ভূত কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার সার্বিক সত্যতা যাচাই ও ব্যাখ্যা চেয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ পাঠিয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড।
গতকাল রোববার (১৬ আগস্ট) ঢাকা বোর্ডের এক অফিস আদেশে এই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
শিক্ষাবোর্ডের জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানটির শতভাগ সাফল্য ও জিপিএ ৫ অর্জন নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। বিষয়টি বোর্ডের নজরে আসার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ তদন্তে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস কর্তৃপক্ষকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে শিক্ষাবোর্ডে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া কারণ দর্শানোর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তলব করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে—৯ম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের তথ্য, ভর্তি সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র, এসএসসির নির্বাচনি (টেস্ট) পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের তালিকা, চূড়ান্ত পর্যায়ে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণকারী শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত তথ্য।
অফিস আদেশে শিক্ষাবোর্ড স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, এটি একটি অত্যন্ত জরুরি নির্দেশনা। নির্দিষ্ট সাত কর্মদিবসের মধ্যে শোকজের জবাব দিতে ব্যর্থ হলে বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শিক্ষাবোর্ডের বিধি অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের শতভাগ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পাওয়ার পর বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, জিপিএ ৫-এর শতভাগ হার বজায় রাখতে ও কৃত্রিম সাফল্য দেখাতে নির্বাচনি পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের ছাঁটাই করা বা ফরম পূরণ করতে না দেওয়ার মতো নিয়মবহির্ভূত কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।
গণমাধ্যমে এসব সংবাদ প্রকাশের পর শিক্ষাবোর্ড বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে সত্যতা অনুসন্ধানে এই কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেয়।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে নবম শ্রেণিতে মোট ৬০১ শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেছিল। অথচ ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে মাত্র ৩৮২ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নবম থেকে দশমে পদার্পণ এবং শেষ পর্যন্ত টেস্ট পরীক্ষার ছাঁটাইয়ের শিকার হয়ে ঝরে পড়েছে ২১৯ শিক্ষার্থী। শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে গেছে তাদের একটি মূল্যবান বছর। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে, স্কুলে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ৪৮৩ জন। এর মধ্যে ১০১ জন অকৃতকার্য হয়েছেন। তাই ৩৮২ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, যেসব শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তাদের অনেককেই নরসিংদীর সানবীন স্কুলে, ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে নরসিংদী মডেল স্কুল, সান শাইন মডেল হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছেন। এসব স্কুলের মধ্যে নরসিংদীর সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছে ৫০ জন। এদের মধ্যে ২৫ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে। ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছে পাঁচজন। এদের মধ্যে তিনজন জিপিএ ৫ পেয়েছে। নরসিংদী মডেল স্কুলে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়েছে চারজন। এদের মধ্যে একজন জিপিএ ৫ পেয়েছে। এবং সান শাইন মডেল হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা দিয়ে একজন জিপিএ ৫ পেয়েছে।
ঝরেপড়া শিক্ষার্থীর ক্ষোভ ও আকুতি
নির্বাচনি পরীক্ষায় তথাকথিত ‘ফেল’ করে জীবন থেকে একটি বছর হারিয়ে মানসিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে অনেক শিক্ষার্থী। এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সাকিব (ছদ্মনাম) অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘আমরা দুই বন্ধু ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে একই সঙ্গে এই স্কুলে পড়েছি। নবম শ্রেণিতেও ভালো মার্কস পেয়ে দশম শ্রেণিতে উঠলাম। কিন্তু টেস্ট পরীক্ষার পর আমাকে বলা হলো আমি নাকি দুটো বিষয়ে ফেল করেছি। তাই ফরম পূরণ করতে দেওয়া হবে না। আমার বন্ধু আজ জিপিএ ৫ পেয়ে আনন্দে নাচছে, আর আমি ঘরের কোণে বসে কাঁদছি। আমার অপরাধটা কোথায় ছিল? স্কুলের সুনাম অর্জনের জন্য আমার জীবন থেকে একটা বছর কেন কেড়ে নেওয়া হলো?’
সন্তানের এমন মানসিক বিপর্যয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন অভিভাবকরাও। এক ছাত্রের বাবা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমার ছেলে পঞ্চম শ্রেণি থেকে টানা এই স্কুলে পড়ছে। সব ক্লাসে পাস করে এসে হঠাৎ টেস্ট পরীক্ষায় এসে ফেল করল কীভাবে? যে ছেলেটাকে তারা পাঁচ বছর ধরে পড়াল, তাকে টেস্টে ফেল করিয়ে যদি বলা হয় সে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার যোগ্য নয়, তবে এই ব্যর্থতার দায় কি স্কুলের শিক্ষকদের নয়? ভালো ছাত্রদের পড়িয়ে জিপিএ ৫ পাওয়ানোয় কোনো বাহাদুরি নেই। এরা শুধু নিজেদের ব্যবসার প্রসারে আমাদের সন্তানদের স্বপ্ন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, এই ফলকেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। টেস্ট পরীক্ষার দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থী ছাঁটাই করা শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চরম ব্যর্থতা। আর ব্যবসায়িক সাফল্যের বলি শিক্ষা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন বলেন, ‘শোকজের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। আমাদের ৪৮৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৩ জন টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ায় তাদের বাদ দিয়ে ৩৮২ শিক্ষার্থীকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তারা সবাই জিপিএ ৫ পেয়েছে। এ নিয়ে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমাদের সব কাজের স্বচ্ছতা রয়েছে। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বোর্ডকে জবাব দেব।’

বিশ্বজিৎ সাহা, নরসিংদী