অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের মৃত্যুতে শোক, মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন
বাংলাদেশের প্রখ্যাত ওষুধবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও জনস্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক (৭৪) আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ওষুধপ্রযুক্তি বিভাগসহ তাঁর সাবেক ছাত্র, সহকর্মী, স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর মেয়ের বাসায় অবস্থানকালে গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৭টা মিনিটের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু দৈনিক সংবাদ পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কাশেম হুমায়ুন।
অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুকের জন্ম কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর গ্রামে। তাঁর বাবা মরহুম হাবিবুর রহমান পেশায় সাবরেজিস্ট্রার ছিলেন। বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে ঢাকার মিরপুর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস গড়ে তোলে তার পরিবার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা লাভের পর আ ব ম ফারুক একই বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের ছাত্র সংগঠন সমাজবাদী ছাত্র জোটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলেরও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।
আজ রোববার (১৬ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে পৌঁছায়। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোকাররম হোসেন খন্দকার ভবনের সামনে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে তাঁর মরদেহ নেওয়া হয়। সেখানে বাদ জোহর প্রথম জানাজা হবে। জানাজা শেষে মরদেহ মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে বাদ আসর দ্বিতীয় জানাজা শেষে দাফন করা হবে।
অধ্যাপক আ ব ম ফারুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক ও সাবেক ডিন ছিলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটের সদস্য এবং শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়া হলের প্রভোস্ট হিসেবেও দুইবার দায়িত্ব পালন করেন।
ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স, ওষুধ প্রযুক্তি, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা এবং জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে অধ্যাপক ফারুকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিজীবন শেষে তিনি সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক এবং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েটস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। এ ছাড়া ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ড. আ ব ম ফারুকের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ নিশ্চিত করতে তিনি কাজ করেছেন। ‘জাতীয় ওষুধনীতি, ২০১৬’ প্রণয়ন উপকমিটির আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
ভোক্তা অধিকার রক্ষায় নিরাপদ খাদ্য ও ওষুধ নিশ্চিতে তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও নীতিনির্ধারণী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ২০১৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টার বাজারে থাকা বিভিন্ন পাস্তুরিত তরল দুধের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করে। ওই গবেষণায় বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের ক্ষতিকর উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে। ফলাফল প্রকাশের পর তৎকালীন সরকারের কিছু আমলা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তাঁকে হুমকি ও আইনি ব্যবস্থার ভয় দেখানো হয়েছিল। চাপের মধ্যেও তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় ছিলেন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি হয় এবং নাগরিক সমাজ তাঁর পাশে দাঁড়ায়।
মৃত্যুর আগপর্যন্ত জনস্বাস্থ্য সচেতনতা, ওষুধশিল্পের মান নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে ড. আ ব ম ফারুক গণমাধ্যমে সোচ্চার ছিলেন। কলামিস্ট হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকারের নীতিনির্ধারণী ত্রুটি সংশোধনে তিনি নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন।
অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের মৃত্যুতে দেশের ফার্মাসিস্ট, শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক ও গবেষকই ছিলেন না; বরং অভিভাবক, মেন্টর ও পথপ্রদর্শক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। শিক্ষা, গবেষণা ও ফার্মেসি পেশার উন্নয়নে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক