নওগাঁর ১৩ পরিবারে শোকের মাতম
পরিবারের সদস্যদের স্বপ্নগুলো পূরণ কেবলই সত্যি হতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ উলট-পালট সবকিছু। সৌদি আরবে সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে হারিয়ে গেল নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় ১৩ পরিবারের স্বপ্ন।
এক সময় তাদের প্রতীক্ষায় পরিবার-প্রিয়জনরা থাকলেও এখন মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ পরিবারগুলো। স্বজন হারানোর কান্না আর আহাজারিতে শোকের ছায়া এলাকাজুড়ে।
আজ সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলেই ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁর আত্রাই উপজেলায়।
নিহতদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার চারজন একই গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গণ্ডগোহালি গ্রামের মহন প্রামাণিক (২২), তার ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (২০), রুবেল প্রামাণিক (৩০) ও কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)। এই উপজেলার নিহত অন্যরা হলেন সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস এলাকার শাহিন হোসেন (৩৮)।
গণ্ডগোহালী, উজানপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহতদের বাড়িতে এখন শুধু কান্নার শব্দ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি পুরো পরিবেশ। কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছে, কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছে। তাদের কেউ আবার বারবার মূর্ছা যাচ্ছে। তাদের চোখের পানি দেখে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষগুলোরও চোখ ভিজে যাচ্ছে। একে অন্যকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেরাই কান্নায় ভেঙে পড়ছে। কারও মুখে কোনো কথা নেই, শুধু প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোক আর বুকফাটা আহাজারি।
গণ্ডগোহালী গ্রামের নিহত মোহন এবং সুমনকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মা ময়না খাতুন বলেন, ‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর, আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনো দিন ছুটিতেও আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করে বাড়ি আসব। বাড়ি এসে বিয়া করমু মা। মেয়ে-টেয়ে দেখ না, আমি ১০টা দেখে একটা বিয়ে করমু। কিন্তু আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।’
একই গ্রামের নিহত রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘আমার রুবেলের নয় বছর হচ্ছে সৌদি যাওয়ার বয়স। সাড়ে ছয় বছর পরে ছুটিতে আইছিল। আসার পরে ছাওয়ালোক আবার বিয়া দিনু। বিয়া করে আবার গেল সৌদি। যেয়ে দুই বছরকার মাথাত আবার আলো বাড়িত। আসে ছয় মাসের ছুটি কাটে গেলো। ছয় মাস ছুটি কাটায়ে যায়ে কেবল তিন মাস হলো। ওটি যায়ে সোফা সেটের কাজ করে হামার ছাওয়াল। আমার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকল না বাবা। আমার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হছে। দুনিয়ার বুকে তো আমাক আর দেখার মতো আর কিছু থাকল না বাবা! ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।’
এদিকে, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন উপজেলার উজানপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তার স্ত্রী সাফিয়া খাতুন। পরিবারের বড় ছেলে ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান। ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে? নিহত ফরিদের স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী মেয়ে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে পুরো পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে।
ডুবাই গ্রামের নিহত হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকরা সবাই ঘুমিয়ে ছিল। কারখানার ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। ওই কারখানার শ্রমিকরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকে এবং রাতে কারখানায় কাজ করত।’
আনোয়ারুল ইসলাম আরও বলেন, ‘হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করে স্থানীয় একটা এনজিওতে চাকরি করত। ওই চাকরিটা চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার জীবন-যাপন করে। পরে জীবিকার সন্ধানে ও পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে সে সৌদি আরবে যায়।’
নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাদের মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার ব্যাপারে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের তৎপর রয়েছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশে মরদেহ আসতে কিছু দিন সময় লাগতে পারে। সৌদি দূতাবাস ও নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ