দানবীয় শাসন ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিজয়ের দিন। এদিন বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে অবিস্মরণীয় এক ঘটনা। প্রায় ১৬ বছরের দানবীয় শাসনের পতন ঘটায় ছাত্র-জনতা।
২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এরপর ‘দিনের ভোট রাতে’, ‘মরা ব্যক্তির ভোট’, ‘ভোট জালিয়াতি’ ও প্রশাসনের সব স্তরকে ব্যবহার করে, ভোট ডাকাতি করে ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ক্রমেই নিষ্ঠুর স্বৈরাচার হয়ে উঠেন তিনি। বিরোধী মত দমন, গণহত্যা, গুম ও খুনের পর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ৩৬তম দিনে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ভারতের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে অবসান হয় দেশের ইতিহাসে অন্যতম এক সুদীর্ঘ ও বিতর্কিত শাসনকালের। এখনও তিনি ভারতের আশ্রয়ে সেখানে রয়েছেন।
শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ভোটাধিকার ও বাক্স্বাধীনতা হরণ, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং মেগা প্রকল্পের নামে ব্যাংক লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সরকারের পক্ষ থেকে অবকাঠামোগত উন্নয়নকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হলেও শেষ সময়ে দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়ে—বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে ঠেকে, খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। এসব জনদুর্ভোগ নিয়ে প্রশ্ন তুললে শেখ হাসিনা ও সরকারের মন্ত্রীরা প্রায়ই উপহাসমূলক মন্তব্য করতেন।
আন্দোলনের সূত্রপাত ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য
জুলাই থেকে শিক্ষার্থীরা লাগাতার আন্দোলন শুরু করলেও নতুন মোড় নেয় ১৪ জুলাই, যখন এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ইঙ্গিত করে ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্য করেন। এর পরপরই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বেরিয়ে এসে স্লোগান দেয়—‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’
পরদিন ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন, আন্দোলনকারীদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ। এরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালায় ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া ও দেশজুড়ে দাবানল
১৭ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে আন্দোলন দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে। ১৮ ও ১৯ জুলাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সরকার কারফিউ জারি করে এবং ওবায়দুল কাদের ‘শুট অন সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ ঘোষণা করেন।
নজিরবিহীন এই দমনপীড়নে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। ঘরে থাকা শিশু, বারান্দায় থাকা সাধারণ নাগরিকও গুলির শিকার হন। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তারাও রাজপথে নেমে আসেন।
৯ দফা থেকে এক দফা : দেশ ছাড়তে বাধ্য হন হাসিনা
শিক্ষার্থীদের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ৯ দফা দাবি ঘোষণা করলেও সরকার গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। ১০ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের গোয়েন্দা কার্যালয়ে (ডিবি) তুলে নিয়ে জোরপূর্বক আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও বার্তা ধারণ করানো হয়।
তবে জনরোষ ও সমন্বয়কদের অনশনের মুখে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় প্রশাসন। ২ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিশাল জনসমুদ্র থেকে ৯ দফা রূপান্তরিত হয় সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ দাবিতে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে যখন সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায় এবং পুলিশ পিছিয়ে আসে। ৪ আগস্ট শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক শক্তিকে মাঠে নামান। দিনভর সংঘর্ষে নিহত হন অন্তত ১১৪ জন। ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাক এলে দুপুরেই স্পষ্ট হয়ে যায় সরকারের পতন আসন্ন। অবশেষে ৫ আগস্ট বেলা আড়াইটায় দিল্লি অভিমুখে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা।

নিজস্ব প্রতিবেদক