ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা
পবিত্র ঈদুল আজহার অনাবিল আনন্দ ও উৎসব যেন সমাজের পিছিয়ে পড়া সব শিশুর জীবনে সমানভাবে পৌঁছে যায়—সেই পরম মানবিক ভাবনা থেকেই মানিকগঞ্জে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য আয়োজন করা হলো এক ব্যতিক্রমী ঈদ আনন্দ ও উপহার বিতরণ কর্মসূচি। আজ শুক্রবার (২৯ মে) সকালে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাটিগ্রামে অবস্থিত ‘ব্লুমস বিশেষায়িত বিদ্যালয়’ প্রাঙ্গণজুড়ে ছিল এক অভাবনীয় উৎসবমুখর পরিবেশ। বিশেষ এই শিশুদের অনাবিল হাসি, কোলাহল আর অবুঝ কৌতূহলে মুখর হয়ে ওঠে পুরো বিদ্যালয় এলাকা।
পবিত্র ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিন উপলক্ষে আজ বিদ্যালয়ের প্রায় অর্ধশত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের হাতে অত্যন্ত যত্নের সাথে তুলে দেওয়া হয় কোরবানির টাটকা মাংস ও উন্নতমানের বিভিন্ন ঈদ খাদ্যসামগ্রী। উপহারসামগ্রীর প্রতিটি প্যাকেটে ছিল খাসির মাংস, সেমাই, চিনি, সুগন্ধি খিচুড়ির চাল, ভোজ্যতেলসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টিকর নিত্যপণ্য। উপহারের প্যাকেট হাতে পেয়ে কেউ আনন্দে বন্ধুদের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে গল্পে মেতে ওঠে, কেউবা আবার কৌতূহলী চোখে তখনই প্যাকেট খুলে দেখার রাঙা আগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, সমাজের মূল স্রোতের বাইরে থাকা এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ঈদের অনাবিল আনন্দ ও উৎসবের আমেজ থেকে বঞ্চিত না রাখতেই প্রতি বছরের মতো এবারও এই মানবিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানিকগঞ্জের কাটিগ্রামে ২০১১ সালে সম্পূর্ণ অলাভজনকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের আধুনিক শিক্ষা, থেরাপি ও সামাজিক পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ‘ব্লুমস বিশেষায়িত বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলায় বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ করা ডিএমপি’র ডিবির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ সহকারী কমিশনার (এসি) শহীদ রবিউল করিম। তার অকাল ও নির্মম মৃত্যুর পর নানা আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিকূলতা এলেও শুভাকাঙ্ক্ষীদের চেষ্টায় থেমে থাকেনি এই মানবিক প্রতিষ্ঠানটির পথচলা।
বর্তমানে এই বিশেষায়িত বিদ্যালয়টিতে অর্ধশতাধিক বিশেষ শিশু নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদান, স্পিচ ও ফিজিক্যাল থেরাপি, মেধা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সহায়তামূলক সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাচ্ছে। এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব পরিবহনে করে বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়া এবং দুপুরে পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থাও নিয়মিত করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্যরা জানান, ২০১১ সালে অল্প কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন ব্লুমসের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পরিচালনা ব্যয় দুটোই ব্যাপক বেড়েছে। বর্তমানে শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন-ভাতা, শিশুদের ফিজিওথেরাপি, খাবার এবং অন্যান্য লজিস্টিকস খরচসহ প্রতি মাসে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ফিক্সড ব্যয় প্রয়োজন হয়। এই ব্যয়ের বড় অংশই নিয়মিত বহন করেন শহীদ রবিউল করিমের পরম বন্ধুরা এবং ব্লুমস পরিবারের আজীবন সদস্যরা। এর পাশাপাশি স্থানীয় কিছু দানশীল মানুষের সহযোগিতাও রয়েছে।
আজকের এই আনন্দঘন ঈদ উপহার বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্লুমসের সভাপতি জিআর শওকত আলী, সদস্যসচিব ও শহীদ এসি রবিউল করিমের আপন ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস, পরিচালক (প্রশাসন) নূর সিদ্দিকী, প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মারুফ আহমেদ দুলালসহ স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক-অভিভাবকেরা।
ব্লুমসের সভাপতি জিআর শওকত আলী বলেন, শহীদ রবিউল করিমের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছয়জন পরম শুভানুধ্যায়ীর ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া ছয়টি খাসি কোরবানির মাধ্যমে আজ সব শিক্ষার্থীর পরিবারে মাংস পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেমাই, চাল ও চিনিও দেওয়া হয়েছে। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষগুলো যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরেকটু এগিয়ে আসেন, তবে শহীদ রবিউল করিমের দেখা স্বপ্নকে আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করে এই বিশেষ শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব হবে।

আহমেদ সাব্বির সোহেল, মানিকগঞ্জ