তালগাছের ডগায় সাখাওয়াতের ৫২ বছর
যশোরের কেশবপুর উপজেলার বায়সা-শ্রীরামপুর সড়ক। দুপাশে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলি জমি আর মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া পিচঢালা পথ। এই সড়কের ধারে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছগুলো কেবল পথচারীদের ছায়া দেয় না, বরং ৬৫ বছর বয়সী সাখাওয়াত হোসেনের ৫২ বছরের জীবনসংগ্রামের সাক্ষী হয়ে আছে।
সাখাওয়াত হোসেন যখন এই পেশায় পা রাখেন, তখন তার বয়স মাত্র ১২ বছর। অভাবের তাড়নায় কোনো ওস্তাদ ছাড়াই নিজের চেষ্টায় আয়ত্ত করেছেন গাছে ওঠার কৌশল। বর্তমানে বার্ধক্য শরীরে ছাপ ফেললেও প্রতিদিন নিয়ম করে ১২টি তালগাছে ওঠেন তিনি। মুচি কাটা, ভাড় বাঁধা আর রস নামানোর প্রতিটি ধাপে তিনি আজ এক অনন্য কারিগর।
সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রতিদিন তিনবার করে তিনি গাছে ওঠেন এবং গড়ে প্রায় ২৫ ভাড় রস সংগ্রহ করেন। রসের স্বাদ ও সতেজতা ধরে রাখতে তিনি বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে নিজে নিজে শিখছি। কোনো ওস্তাদ ছিল না। এখন এই রসই আমাদের সংসার চালায়।
৯ সদস্যের বড় পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস এই তালের রস। গাছতলায় বসেই প্রতি গ্লাস রস মাত্র ১০ টাকায় বিক্রি করেন তার ছেলে ফজর আলী এবং নাতি ইসরাফিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই টাটকা রসের স্বাদ নিতে ভিড় জমায় সড়কের ধারে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা বিলুপ্তির পথে থাকলেও সাখাওয়াত হোসেনের মতো মানুষেরা সেই ধারাকে এখনও আগলে রেখেছেন। গ্রামের মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন গাছি নন, পরম মমতায় হয়ে উঠেছেন সবার প্রিয় ‘সাখাওয়াত দাদু’। তালের মিষ্টি রসের মতোই নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু তিনি বিলিয়ে দিচ্ছেন এই লোকজ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সাখাওয়াত হোসেনের মতো অভিজ্ঞ গাছিরা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ৫২ বছর ধরে তিনি যে নিষ্ঠা ও ভালোবাসা নিয়ে তালগাছের যত্ন নিচ্ছেন এবং রস সংগ্রহ করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তিনি আরও বলেন, কেশবপুরের মাটির গুণেই এখানকার তালের রস সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।
আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, তালগাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নয়, বজ্রপাত প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত কৃষকদের তালগাছ রোপণে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সাখাওয়াত হোসেনের মতো পরিশ্রমী মানুষেরা তালের রস সংগ্রহ করে যে জীবিকা নির্বাহ করছেন, তা স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক উদাহরণ।
তাদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানান মামুন।

ইনামুল হাসান, যশোর (মনিরামপুর-কেশবপুর)