ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে তরমুজ, দিশেহারা চাষি
পটয়াখালী বাউফল উপজেলায় এবার তরমুজ চাষিদের মুখে হাসি নেই। মৌসুমের শুরুতে গামি স্টেম ব্লাইট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়া, সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি, ভরা মৌসুমে তরমুজের দাম পড়ে যাওয়া ও ডিজেল সংকটে পরিবহণ ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। তরমুজ চাষিরা মূলধন হারিয়ে এখন দিশেহারা।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর ধরে উপকূলীয় এ উপজেলায় তরমুজের আবাদ বেড়েই চলেছে। কম সময়ে অধিক লাভবান হওয়ায় তরমুজ চাষাবাদে ঝুঁকেছেন চাষিরা। এদের মধ্যে বেশিরভাগই মৌসুমি চাষি।
চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় চার হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। যা কয়েক বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। এ বছর তরমুজ চাষে খরচও হয়েছে বেশি। চাহিদার তুলনায় ফলন বেশি হওয়ায় দাম কমে যাওয়াসহ নানা সংকটে লোকসানে পড়েছেন তরমুজ চাষিরা।
তরমুজ চাষিদের ভাষ্য মতে, রজমানের শুরুর দিকে বাজার দর ভালো ছিল। তখন তরমুজ পরিপক্ব হয়নি। ঈদের পর ফল পরিপক্ব হতে শুরু করে এবং বাজারে তরমুজের জোগান বাড়তে থাকে। পাইকারি বাজারে চাহিদার তুলনায় বেশি তরমুজের আমদানি ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যায়। এতে তরমুজের পাইকারি বাজারে দাম কমে যায়। অপর দিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহণ ব্যয়ও বেড়ে যায়। যে কারণে এ বছর তরমুজে লোকসানের হার বেশি।
উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চাষি মো. লোকমান হোসেন। চলতি মৌসুমে ২৫ একর জমিতে দলবদ্ধভাবে তরমুজ আবাদ করেছেন। এতে তার খচর হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। জমির লিজ, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খচর বেশি। ২৫ একর জমিতে মোট তরমুজ গাছ ছিল প্রায় ৪৫ হাজার। গামি স্টেম ব্লাইট রোগে গাছ মারা গেছে প্রায় সাত হাজার ৫০০। অনেক গাছে ফলও আসেনি। প্রায় ৩৫ হাজার ফল বিক্রি করেছেন। তবে পাইকারি বাজারে দরপতন হওয়ায় মাত্র ২০ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন তিনি। তাদের লোকসান হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
ক্ষতির মুখে পড়া চাষি লোকমান বলেন, পাঁচজন দলবদ্ধ হয়ে তরমুজ চাষ করেছি। মৌসুমের শুরু থেকে সার সংকটের কারণে বেশি দামে সার কিনতে হইছে। বীজ, ওষুধ, শ্রমিক ব্যয়ও বেশি হয়েছে। সবশেষ ডিজেল সংকটের কারণে পরিবহণ ব্যয়ও ছিল গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আর বাজারদর খারাপ যাওয়ায় ভালো দাম পাইনি। এ কারণে লোকসান বেশি হয়েছে।
চর কালাইয়া এলাকার চাষি মো. শাহিন প্যাদা প্রথম বারের মতো পাঁচ একর জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। ফল পরিপাক্ব হাওয়ার কয়েকদিন আগে হঠাৎ করে অজানা রোগে তার সাড়ে আট হাজার গাছ মারা যায়। কিছু ফল বিক্রি করলেও তার লোকসান হয়েছে প্রায় আট লাখ টাকা।
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চাষি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ১৫ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। ঈদের কয়েকদিন আগে ২৫ হাজার টাকা শ ফল বিক্রি করেছি। ঈদের পর হঠাৎ করে বাজারে তরমুজের চাহিদা কমে যাওয়ায় দামও কমে যায়। মাত্র সাত হাজার টাকা শ বিক্রি করছি। এতে প্রায় ১৪ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
কালাইয়া এলাকার তরমুজ চাষি মো. রিয়াজ হোসেন বলেন, শখ করে তিনজনে মিলে পাঁচ কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছিলাম। কানি প্রতি জমিতে খরচ হয়েছে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা। তরমুজ বিক্রি করেছি এক লাখ ২০ হাজার। প্রতি কানি জমিতে দেড় লাখ টাকা করে সাড়ে সাত লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, গত এক দশক ধরে উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের চর কালাইয়া, চর শৌলা, চর ফেডারেশন, চর মোয়াজ্জেম, বগির চর, চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের চরয়াঢেল, চর মিয়াজান, চর নিমদী, চর ব্যারেট, চর রায় সাহেব, কেশবপুর ইউনিয়নের চর মমিনপুর ও ধুলিয়া ইউনিয়নের চর মঠবাড়িয়া, চর বাসুদেব পাশাসহ কাছিপাড়া, কনকদিয়া ও বগা ইউনিয়নের তরমুজের আবাদ বেড়েছে। অধিক লাভ হওয়ায় মৌসুমি চাষিরা তরমুজ চাষে বেশি ঝুঁকেছেন। বাজারে চাহিদার তুলনায় বেশি আবাদের কারণে বাজারে দাম কম। অপরদিকে উৎপাদন খরচ বেশি। যে কারণে এ বছর তরমুজে লোকসানের হার বেশি। প্রায় ৭০ শতাংশ তরমুজ চাষির লোকসান হয়েছে।
সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও স্থানীয় সূত্রের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় প্রায় তিন কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে বিক্রি হয়েছে দেড় কোটি টাকা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মিলন বলেন, এ উপজেলায় তরমুজের আবাদ বেশি হয়েছে। বাজারে চাহিদার তুলনায় ফল বেশি থাকায় দাম কমে যায়। এ ছাড়া চাষিরা মাত্রাতিরিক্ত সার, কীটনাশক ব্যবহার করায় উৎপাদন খচর কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই চাহিদার তুলনায় ফলন বেশি হওয়ায় দাম কম, অপরদিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের হার বেড়ে গেছে।
চাষিদের কৃষি বিভাগের অনুমোদিত মাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে এ কৃষি কর্মকর্তা বলেন, দিন দিন তরমুজের আবাদ বাড়ছে। যে কারণে বাজারে তরমুজের আমদানি বেশি থাকে, দাম কম থাকে। উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে না আনতে পারলে লোকসানের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।

এম.এ হান্নান, পটুয়াখালী (বাউফল-দুমকি)