তারেক রহমানের নেতৃত্ব দ. এশিয়া ও বিশ্বের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত বছরের বড়দিনে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে মাত্র সাত সপ্তাহ পর, এই দক্ষিণ এশীয় দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তিনি।
নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) সাধারণ নির্বাচনে ৩০০ আসনের আইনসভায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০০টিরও বেশি আসনে জয় পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন।
জানুয়ারির শুরুতে ‘টাইম’ তারেক রহমানের মুখোমুখি হয়েছিল। সেখানে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং সামাজিক বিভাজন দূর করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। প্রথম অগ্রাধিকার কী হবে—জানতে চাইলে তারেক রহমান উত্তর দেন, ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়টি হলো আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। তৃতীয়টি হবে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করা। আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নীতি যাই হোক না কেন, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।’
বাংলাদেশের এই নতুন নেতার সঙ্গে টাইমের সাক্ষাৎকারের পাঁচটি প্রধান দিক এখানে তুলে ধরা হলো:
ক্ষত নিরাময়
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, পাশাপাশি হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। সেই ক্ষতগুলো এখনো দগদগে। তারেক রহমানকে সামরিক বাহিনী, আদালত, সিভিল সার্ভিস এবং নিরাপত্তা সংস্থাসহ হাসিনার আওয়ামী লীগের মাধ্যমে সম্পূর্ণ রাজনীতিকরণ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে ফিরে আসার পর থেকে তারেক রহমান ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন এবং প্রতিশোধ পরায়ণতা ত্যাগের অঙ্গীকার করেছেন। শান্তি বজায় রাখতে তাঁকে নিরলসভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রতিশোধ কোনো কিছু ফিরিয়ে আনবে না। বরং আমরা যদি তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি এবং দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি, তবেই ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব।’
অর্থনীতি মেরামত
হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ছিল, যেখানে জিডিপি ২০০৬ সালের ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। কিন্তু ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বৈষম্য এবং যুব বেকারত্বের কারণে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দানা বাঁধে। হাসিনার পতনের পরও উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং টাকার মান কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে, যদিও যুব বেকারত্বের হার বর্তমানে ১৩.৫ শতাংশ। বিএনপির অন্যতম প্রধান নীতি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে নারী ও বেকারদের মাসিক নগদ অর্থ প্রদান করা, যদিও এর অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। তারেক রহমান তরুণ উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল অর্থনীতিতে যুক্ত করতে কানেক্টিভিটি বাড়াতে চান এবং ব্যাংকিং খাতকে উদার করতে চান। এছাড়া বিদেশে কর্মরত প্রায় ১০ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্গঠন
রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির কারণে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত এবং বাংলাদেশী পণ্যের প্রধান ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাবে। শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠতা থাকায় তাঁর পতনের পর দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। তারেক রহমান বলছেন, হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে হওয়া অনেক চুক্তিতে ‘অসামঞ্জস্য’ রয়েছে যা সংশোধন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমরা প্রতিবেশী। তবে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং আমাদের জনগণের স্বার্থ রক্ষা সবার আগে, এরপর আমরা সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করব।’
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেছিল। ট্রাম্প শুরুতে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলেও ঢাকা তা কমিয়ে ২০ শতাংশ এবং সম্প্রতি ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তারেক রহমান বোয়িং বিমান এবং মার্কিন জ্বালানি ক্রয়ের মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে শুল্ক আরও কমানোর লক্ষ্য রাখছেন।
ক্রমবর্ধমান ইসলামপন্থী শক্তি
নির্বাচনে বিএনপির পর দ্বিতীয় বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তাদের দলীয় সংবিধানে শরিয়াহ আইনের লক্ষ্য থাকলেও তারা বর্তমানে ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী’ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরে নমনীয় অবস্থান নিয়েছে। তবে সমালোচকরা তাদের আমূল পরিবর্তন নিয়ে সন্দিহান। বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সরকারে জামায়াতের প্রভাব সীমিত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। তারেক রহমান বলেন, ‘এটি কেবল বিএনপির দায়িত্ব নয়, বরং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব যাতে আমরা ৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে না যাই।’
ছাত্রদের ভবিষ্যৎ
হাসিনা পতনের আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্রদের গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় অনেক নারী ও সংখ্যালঘু সদস্য দলত্যাগ করেন। বিপ্লবোত্তর সময়ে ছাত্র আন্দোলন বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর আধিপত্য দেখে অনেক তরুণ মোহভঙ্গ হয়েছেন। সাবেক এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা, যিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ে পরাজিত হয়েছেন, তিনি মনে করেন প্রকৃত রাজনৈতিক বিকল্প রাতারাতি আসবে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে আস্থা তৈরির মাধ্যমে আসবে। তারেক রহমান অবশ্য বলছেন, যারা গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছেন তাদের স্মৃতির প্রতি তিনি দায়বদ্ধ। তিনি বলেন, ‘যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের অত্যন্ত জোরালো দায়িত্ব রয়েছে।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক